fbpx

গ্রাম বাংলা: আমার আমাকে ফিরে পাওয়ার গল্প

Home » গ্রাম বাংলা: আমার আমাকে ফিরে পাওয়ার গল্প

৩২ বছর সরকারী চাকরী করার পর ধুপ করে সারাদিন বাসায় বসে থাকা এতো কঠিন আমি আগে বুঝতে পারি নাই। আমার নাম আবুল কালাম, অবসর প্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা। ৩২ বছর অনেক লম্বা সময়। কিভাবে কেটে গেছে আমি জানি না। অবসর নেয়ার পর প্রথম ২ সপ্তাহ আমি খুব আরাম করে সকাল ১০ টায় ঘুম থেকে উঠলাম। অলস দুপুরে রকিং চেয়ারে হেলান দিয়ে চা’র কাপ হাতে পত্রিকা পড়লাম। সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত টিভিতে নিউজ চ্যানেল ঘুরতে থাকলো। ২ সপ্তাহ পর আমি টের পেলাম আমার আসলে কিছু করার নাই। নিউজ দেখতে দেখতে আর পত্রিকা পড়তে পড়তে সব খবর আমার মুখস্থ হয়ে গেল, চা খেতে খেতে আমার চা’র কাপ দেখলেই মেজাজ খারাপ হওয়া শুরু হল। রিটায়ারের নামে আমি যে আসলে বাতিলের খাতায় নাম তুলেছি সেটা বুঝতে আমার বেশি সময় লাগে নাই।

ঢাকায় আমার ২২০০ স্কয়ার ফিটের বিশাল একটা বাসা আছে। বাসায় আমি আর আমার স্ত্রী আমাদের ছেলে, ছেলের বৌ আর আমাদের এক মাত্র নাতিটা কে নিয়ে থাকি। আমার নাতির নাম নিশান। আমার দাদুভাই একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ক্লাস থ্রি তে পড়ে। রোজ সকালে সে একটা ইয়া মোটা ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যায়। আমার মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছা করে ঐ ব্যাগে কি এতো বই আছে যেটা ৬ বছরের একটা বাচ্চা পড়া লাগে। আজকে এই টিচার, কালকে ঐ টিচার, পরশু পরীক্ষা : সারাদিন দৌড়াদৌড়ি। ৬ বছরের একটা বাচ্চার এতো প্রেশার! নিশানের জন্য আমার খুব মায়া হয়। যুগ বদলে গেছে, বদলে গেছে মানুষ ও। চারিদিকে শুধু কম্পিটিশন। সব বাবা মা’র সারাদিন টেনশন, এই বুঝি ছেলে অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে গেল ! কি যে একটা অসুস্থ অবস্থা …

গ্রামের স্কুলে একটি শিশু মায়ের কোলে বসে চক আর শ্লেটে অক্ষর শিখছে, ফটোগ্রাফার: রাফিদ আল যাহুর
ফটোগ্রাফার: রাফিদ আল যাহুর

একদিন সকালে নাস্তার টেবিলে আমার ছেলেকে বললাম,

— “সামনেই তো নিশানের স্কুলে সামার ভ্যাকেশান। ভাবছি ওকে নিয়ে এবার আমাদের গ্রামটা ঘুরে আসবো।”

— “সে তো খুব ভালো কথা বাবা কিন্তু আমার তো অফিস চলবে আর ওর আম্মুর ও চেম্বার খোলা, আমাদের তো মনে হয় যাওয়া হবে না।”

বৌ’মা বলল, “বাবা মা নিশান কে নিয়ে ঘুরে আসুক। নিজের গ্রাম, নিজের মানুষদের দেখে আসা উচিৎ। সারা বছর স্কুল, টিচার এসব নিয়ে আমরা ছেলেটাকে রোবট বানায়ে ফেলতেসি। ছেলেটা গ্রাম কি এটাই তো জানে না। সারাদিন বই, টিচার আর ভিডিও গেমস…”

গ্রামের বিল থেকে একটি মেয়ে শাপলা ফুল তুলছে, ফটোগ্রাফার: মোয়াজ্জেম মোস্তাকিম
ফটোগ্রাফার: মোয়াজ্জেম মোস্তাকিম

কমলাপুর স্টেশনের তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেনের ‘ঘ’ বগীতে আমি আমার স্ত্রী আর আমাদের নাতি নিশান বসে আছি। নিশান খুব এক্সাইটেড। সে একটা কালো টুপি পড়েছে। একটু পর পর ওর দাদুমনি কে বলছে,

— “দাদুমনি, আমাদের ভিলেজটা অনেক বিউটিফুল তাই না?”

— “হ্যা দাদুভাই।”

— “আমি পুকুরে সুইমিং করবো। দাদুভাইয়ের সাথে ফুটবল খেলবো।”

আমি হেসে নিশানকে কোলে নিয়ে বললাম,

— “আমি তোমাকে আমার স্কুলে নিয়ে যাবো দাদুভাই।”

— “গ্রেট ! সবসময় তুমি আমাকে স্কুলে ড্রপ করে এসেছ, এবার আমি তোমাকে তোমার স্কুলে ড্রপ করবো!”

আমার নাতিটা খুব খুশি। কিন্তু আমিও কি কম খুশি? কতদিন পর আবার গ্রামে ফিরে যাচ্ছি ! আমাদের সেই বাড়ি, সেই স্কুলের মাঠ; যেখানে ফুটবল খেলে আমার বেড়ে ওঠা। আমার ঘরের পেছনের সেই আম গাছ টা, আমাদের বাড়ির পাশের মসজিদ, তার সামনেই আমার স্কুল, আমাদের সেই শান বাঁধানো পুকুর ঘাট… আহা!

বৃষ্টি হচ্ছে, গ্রামের জলাশয়ের সামনে মা ও মেয়ে, ফটোগ্রাফার: পলল ঘোষ
ফটোগ্রাফার: পলল ঘোষ
গ্রামের নদীতে একজন মহিলা কলসি দিয়ে পানি ভরছে, আকাশ থেকে তোলা ছবি, ড্রোন ভিউ, এরিয়েল ভিউ, ফটোগ্রাফার: শামীম শরিফ সুষম

ফটোগ্রাফার: শামীম শরিফ সুষম

আমাদের গ্রামের নাম আনন্দপুর। ময়মনসিংহ জেলার শম্ভুগঞ্জের ছোট্ট একটা গ্রাম। আমরা দুপুর নাগাদ আনন্দপুর পৌঁছলাম। ভ্যান দিয়ে গ্রামের মেঠো পথ মাড়িয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছি! চারদিকে সবুজ আর সবুজ। এতো সবুজ দেখে নিশানের সে কি বিস্ময় ! ছেলেটা সারাজীবন টিভিতেই গ্রাম দেখে গেছে, চোখের সামনে দেখে তার উচ্ছ্বাস আর কমে না। বাড়িতে পৌঁছে আমার ছোটভাই বোনদের সাথে দেখা হল। সবাই আমাকে দেখে খুব খুশি। তবে বেশি খুশি নিশানকে দেখে। কেউ আমার নাতিকে কোল থেকে নামাতেই চায় না। এরাই তো আমার আপনজন, আমার আত্মার আত্মীয়। কতদিন দেখা নাই। হঠাৎ আমার মন একটা অদ্ভুত প্রশান্তিতে ঠাণ্ডা হয়ে গেল। রিটায়ার করার পর সব সময় একটা অস্থিরতায় থাকতাম। হুট করে দেখি সেটা নাই।

দুপুরে নিশানকে নিয়ে আমি পুকুরে নামলাম। সেই পুরানো পুকুর, সেই শান বাঁধানো ঘাট, স্কুল থেকে ফিরে যেখানে বই খাতা ফেলে লাফ দিয়ে সাতরে আরেক পাড়ে যাওয়া ছিল আমাদের রোজকার রুটিন। আহা কি দিন ছিল সেগুলো! নিশান আমার সাথে পুকুরে নেমেছে। আমি কোনদিন আমার নাতিকে এতো খুশি দেখিনি। ছেলেটার পানিতে ঝাপ্টাঝাপ্টি থামতেই চায় না! বহু কষ্টে ঠাণ্ডা লেগে যাবার ভয় দেখিয়ে ছেলেটাকে পানি থেকে তোলা গেল। দুপুরে পুকুরের রুই মাছ দিয়ে ভাত খেয়ে বিকালে আমি নিশান কে নিয়ে আমার স্কুলে ঘুরতে গেলাম। খুব সাধারণ একটা গ্রামের স্কুল। একতলা বিল্ডিং, অপরিষ্কার বারান্দা। কত কত স্মৃতি ! এই বারান্দায়, এই মাঠে, এই বেঞ্চি-গুলোয় এখনো আমার ছোঁয়া লেগে আছে। ভাবতেই মন ভালো হয়ে যায়। নাতিকে নিয়ে আমার স্কুল ঘুরিয়ে দেখাতে দেখাতে স্কুল ছুটি হয়ে গেল। দেখি একদল দস্যি ছেলে ফুটবল নিয়ে মাঠে নেমে গেছে। নিশান দৌড়ে ওদের মাঝে ঢুকে ফুটবলে খেলতে লেগে গেল। নিশানের আনন্দ দেখে আমিও মনে আমার শৈশবে ফিরে গেলাম। আমিও মাঠে নেমে এগিয়ে গেলাম। বয়স হয়ে গেছে, রিটায়ার করেছি কিন্তু মনের বয়স অন্তত আজকের জন্য হলেও ১৬ থাকুক।

গ্রামের কাদামাখা মাঠে ছেলেরা ফুটবল খেলছে, বাংলাদেশের পুরাতন ছবি, ১৯৯২, ফটোগ্রাফার: স্টিভ ম্যাককারি
বাংলাদেশ ১৯৯২, ফটোগ্রাফার: স্টিভ ম্যাককারি
গ্রামের উঠানে একটি শিশু দুটি গরুর সাথে খেলছে, ফটোগ্রাফার: মোয়াজ্জেম মোস্তাকিম
ফটোগ্রাফার: মোয়াজ্জেম মোস্তাকিম

সন্ধ্যার দিকে আমাদের বাড়ির রাখাল সালাম গাছে উঠলো। আমি নিশান কে বললাম,

–“দাদুভাই, ছোটবেলায় সালামের মত আমিও এই গাছে চড়ে কত আম পেড়েছি…”

–“আমিও গাছে উঠবো দাদুভাই! প্লীজ প্লীজ…”

গাছে কি আর চড়া যায়? আমি নিশান কে কাঁধে নিয়ে দাঁড়ালাম, হাত বাড়িয়ে গাছ থেকে ছোট একটা আম ছিঁড়েই সেই কি খুশি!

পরদিন দুপুরে আমরা নদীতে গোসল করতে গেলাম। হায় রে আমার চিরচেনা ব্রহ্মপুত্র নদ! কি বিপুল ছিল তার জলরাশি, কি ছিল তার স্রোত! আজ নদী শুকিয়ে প্রায় খাল হয়ে গেছে। কিন্তু এই জরাজীর্ণ হাল দেখেও নিশানের সে কি আনন্দ! আমাদের গ্রামের মোসলেম মাঝি নিশান কে কোলে নিয়ে নৌকায় তুলে দিল, আমরা দাদু নাতি পুরো বিকাল নদীতে ঘুরে বেড়ালাম। নিশান দেখলাম মোসলেমের সাথে হাত নেড়ে নেড়ে খুব গল্প করছে। কি সহজ সরল সাধারণ এসব মানুষের জীবন। ঢাকার ঐ উঁচু উঁচু অট্টালিকায় ৬ বছরের একটা শিশুর সাথে গল্প করার মত সময়টা পর্যন্ত কারো নেই। সবাই কত ব্যস্ত! সবাই কিভাবে যেন নিজেকে খুঁজতে গিয়ে বাকিদের হারিয়ে বসে আছে!

গ্রামের নদীধারে একদল শিশু গোসল করছে, একটি শিশু নদীতে লাফ দিচ্ছে, দূরেই একটি নৌকা ভেসে যাচ্ছে, ফটোগ্রাফার: জিয়া উদ্দীন

ফটোগ্রাফার: জিয়া উদ্দীন
গ্রামের নদীতে দুটি শিশুর গোসল করার উচ্ছল মুহূর্ত, ফটোগ্রাফার: মোয়াজ্জেম মোস্তাকিম

ফটোগ্রাফার: মোয়াজ্জেম মোস্তাকিম
আকাশ থেকে দেখা গ্রামের নদীর ছবি, এরিয়েল ভিউ, ড্রোন ভিউ, ফটোগ্রাফার: শামীম শরিফ সুষম

ফটোগ্রাফার: শামীম শরিফ সুষম

রাতের খাবারের পর আমি আর দাদুভাই হাঁটতে বের হয়েছি। হঠাৎ নিশানের চিৎকার “লুক দাদুভাই, ফায়ারফ্লাইজ ! ফায়ারফ্লাইজ”

পুকুর পাড়ের ঝোপে অসংখ্য জোনাকি জ্বলছে আর নিভছে। আমার মনে পড়ে গেলো, নিশানের বয়সে আমি বয়ামে ভরে ভরে জোনাকি ধরে রাতে ঘরে রেখে দিতাম; সারারাত দেখতাম। হঠাৎ আমার নিজেকে এক দুরন্ত কিশোর মনে হল, মনে হল ৩২ বছরের কর্মজীবনে আমি ভুলে গিয়েছিলাম আমার সেই কিশোর স্বত্বাকে, আমার আমি কে। ভুলে গিয়েছিলাম আমি কে, কোথায় আমার অতীত, কোথায় আমার প্রাণের স্পন্দন।

৫ দিন পর নিশান ওর দাদুমনির সাথে ঢাকায় ফিরে গেলো। আমি ফিরে যাই নি। আমি ঠিক করলাম, এখানেই থেকে যাবো। কারণ আমি জানি যে শান্তি, যে আনন্দ আমি আনন্দপুরে এসে ফিরে পেয়েছি, সেটা আমি অন্য কোথাও পাবো না।

গাছে পাতার মত জ্বলতে থাকা জোনাকীর চিত্রকর্ম, শিল্পী: মহিউদ্দিন মজুমদার
ইলাস্ট্রেশন: মহিউদ্দিন মজুমদার
Scroll to Top