fbpx

Walk off-trail এর আজ দ্বিতীয় পর্ব: আলীকদম থেকে থানচি বাইক রাইডিং

বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর রাস্তা কোনটা? কোন রাস্তায় বাইক বা সাইকেল রাইড সবচেয়ে থ্রিলিং? আপনি নিশ্চয়ই উত্তর দিবেন মেরিন ড্রাইভ। কিন্তু না, মেরিন ড্রাইভ না। বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর রাস্তা থানচি থেকে আলীকদম। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় আড়াই হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ের ওপর দিয়ে আঁকাবাঁকা আর উঁচু-নিচু এই রাস্তা বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু রাস্তা।

বান্দরবানের অসহ্য সবুজের মাঝ দিয়ে নির্মিত দেশের সবচেয়ে উঁচু রাস্তা ‘থানচি-আলীকদম’ এর সৌন্দর্য্যের বর্ণনা এভাবে লিখে দেয়া সম্ভব না। নিজের চোখে না দেখলে এই রুপ বিশ্বাস হবে না। চারিদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। এই মেঘ, এই রোদ! এই অসহ্য গরম, এই অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা! আপনি বাইকে বসে পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে আড়াই হাজার ফিট উঁচু দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন হঠাৎ দেখলেন, অনেক দূরে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত! ভাবা যায়?

“পাথর কেটে পথ বানানো, তাই হয়েছে ব্যর্থ”। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘ছেলেটি’ পাথর কেটে পথ বানাতে ব্যর্থ হলেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৬ ইসিবি সফল হয়েছে। ১৪ বছরের চেষ্টায় মেঘের ওপর বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু এ সড়ক বানিয়েছেন সেনা সদস্যরা। কিছুদিন আগেও দুর্গম এই এলাকায় যাওয়ার কোন উপায় ছিল না। বান্দরবানের দুই প্রতিবেশী উপজেলা থানচি আর আলীকদমের মধ্যে সড়ক পথে দূরত্ব ছিল ১৯০(!) কিলোমিটার।

এরপর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে থানচি থেকে আলীকদম পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক নির্মাণে সময় লেগেছে ১০ বছর। সার্ভে সহ অন্যান্য কাজ শুরু হয় আরও ৪ বছর আগে থেকে। নির্মাণ-কালীন বিভিন্ন দুর্ঘটনায় সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের ৩ জন সদস্য মৃত্যুবরণ করেন। ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই রাস্তাটি সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

যদিও: এই রাস্তায় কোন বাস চলে না। মোটর সাইকেল, সাইকেল আর চাঁদের গাড়িতে চড়ে আপনি এই রাস্তায় ঘুরতে পারবেন। তবে এই রাস্তাকে অনুভব করতে হলে আপনাকে অতি অবশ্যই বাইকেই চড়তে হবে। যারা বাইকার আছেন, ঢাকা থেকে বাইক নিয়ে ডিরেক্ট চলে যান।

যদি আপনার নিজের বাইক না থাকে কিংবা আপনি যদি বাইক চালাতে না পারেন, কোন অসুবিধা নাই। থানচি বাজার এবং আলীকদম বাজার থেকে বাইক পাওয়া যায়। এরা সারাদিন বহুবার থানচি থেকে আলীকদম আসা যাওয়া করে। বাইকে চালকসহ তিনজন বসতে পারবেন। ২ জন গেলে ভাড়া ৬০০ টাকা, ১ জন গেলে ৫০০ টাকা।   

থানচি-আলীকদম রাস্তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গাটার নাম ‘ডিম পাহাড়’। পাহাড়টা দেখতে ডিমের মত বলেই এমন নাম। স্থানীয় ম্রো’রা এই পাহাড় কে ডাকে ‘ক্রাউডং’ পাহাড়। এত সুন্দর পাহাড় অন্তত বাংলাদেশে আর কোথাও নাই। আপনি যখন বাইকে করে এই পাহাড়ের উপর আসবেন অদ্ভুত একটা ঠাণ্ডা বাতাস সারা শরীর দিয়ে বয়ে যাবে।

ডিম পাহাড়ে কোন এক অজানা কারণে সবসময় ঠাণ্ডা বাতাস থাকে। ব্যাপারটা একদম সরাসরি অনুভব করা যায়। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ডিম পাহাড়ে পৌঁছালেই ঠাণ্ডা বাতাস। আর পাহাড় থেকে যে ভিউ পাওয়া যায় সেটা এত বেশি সুন্দর যে আপনাকে দেখতে হবে, লিখে বোঝানো সম্ভব না।

আলীকদমে বসবাসকারী টিপরা (ত্রিপুরা) সম্প্রদায়ের আদিবাসীদের মধ্যে ডিম পাহাড় নিয়ে একটা উপকথা প্রচলিত আছে। উপকথাটা এই রকম, উশে নামে খুব মা ভক্ত এক ছেলে ছিল। ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে মা’ই তার একমাত্র সম্বল। সেই মা একদিন খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। প্রাণ যায় যায় অবস্থা। গ্রাম্য ওঝা উশের মাকে দেখে জানালেন এই রোগ নিরাময়যোগ্য না। ধুঁকে ধুঁকে তার মাকে মরতে হবে।

তবে মাকে বাঁচানোর একটা উপায় আছে। উশের সম্প্রদায় যেখানে বসবাস করে সেখান থেকে ৩ দিনের হাঁটা দূরত্বে ডিম পাহাড়ের অবস্থান। প্রতি পূর্ণিমা রাতে ডিম পাহাড়ের চূড়ায় এক অদ্ভুত ফুল ফোটে। আবার সকালবেলায় সেই ফুল ঝরে পড়ে। সেই ফুলের রস যদি খাওয়ানো যায় তবেই উশের মা সুস্থ হবে।

এদিকে ডিম পাহাড়ে আজ পর্যন্ত কেউই পৌঁছাতে পারে নি। যারাই চেষ্টা করেছে তারাই নিরুদ্দেশ হয়েছে। অনেকে বলে সেই পাহাড়ে এক দানব থাকে যে ফুলগুলোকে পাহারা দেয়। কেউ পাহাড়ে উঠলেই দানবটা তাকে মেরে ফেলে। এতসব জানা সত্ত্বেও উশে সিদ্ধান্ত নিলে সে যাবেই। একা যেতে সাহস না পাওয়ায় বন্ধু থুই প্রু কে সাথে নিয়ে রওনা দিল ডিম পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। পাহাড়ি পথে তিন দিন তিন রাত হাঁটবার পর অবশেষে তারা পৌঁছল ডিম পাহাড়ের চূড়ার কাছাকাছি।

থুই প্রু কে রেখে উশে একাই পাহাড়ের চূড়ার দিকে রওনা দিল। প্রয়োজন তার, ঝুঁকি সে একাই নিবে। ঠিক মাঝরাতে আকাশ যখন পূর্ণিমার আলোয় সাদা হয়ে গেছে, তখন উশেকে আবারও দেখতে পেল থুই। থুইকে উদ্দেশ্য করে উশে কিছু একটা ছুঁড়ে মারল। সেটা গড়াতে গড়াতে থুইয়ের কাছাকাছি এসে থামল। থুই দেখে একটা থলে যার ভিতরে পাথর আর সেই অতি আকাঙ্ক্ষিত পাহাড়ি ফুল। উশেকে ইশারা দিয়ে থুই জানাল যে সে ফুলগুলো পেয়েছে। উত্তরে উশে জানাল সে নিচে নামবে, থুই যেন তার জন্য অপেক্ষা করে।

উশের সাথে থুইয়ের সেই শেষ দেখা। আর কোনদিন তার খোঁজ পাওয়া যায় নি।

পাহাড়ের নিচ থেকে মেঘে ঢাকা রহস্যময় ডিম পাহাড় দেখা যাচ্ছে
পাহাড়ের নিচ থেকে মেঘে ঢাকা ডিম পাহাড়

যাইহোক, আমরা বাস্তবে ফিরে আসি। থানচি থেকে আলীকদম পুরা রাস্তাটাই সবুজের চেয়েও সবুজ। পাহাড়ি রাস্তার ধারে ধারে ফুটে আছে নানা রঙের পাহাড়ি ফুল। একটু পর পর একটা বাজার, দোকানপাট। ওদের সহজ সরল জীবনযাত্রা যে কাউকে মুগ্ধ করবে। পুরা রাস্তাটাই একটা নতুন এক্সপেরিয়েন্স। আপনি নিজে না গেলে সেটা কখনোই অনুভব করতে পারবেন না।

তাহলে এক নজরে গুগল ম্যাপে পুরো থানচি থেকে আলীকদম সড়ক দেখে নেয়া যাক।

কিভাবে যাব?

ঢাকা থেকে সড়ক পথে বান্দরবান চলে আসবেন। সেখান থেকে লোকাল বাসে কিংবা চান্দের গাড়িতে করে থানচি বাজার চলে যান। এরপর থানচি বাজার থেকে মোটরবাইকে করে ডিম পাহাড় হয়ে আলীকদম। বাইকাররা সারাদিন বহুবার থানচি থেকে আলীকদম আসা যাওয়া করে। বাইকে চালকসহ তিনজন বসতে পারবেন। ২ জন গেলে ভাড়া ৬০০ টাকা, ১ জন গেলে ৫০০ টাকা।

আপনি চাইলে উল্টো দিক থেকে, অর্থাৎ আলীকদম থেকে থানচি হয়েও বাইক রাইডটি সম্পূর্ণ করতে পারেন।

শেষ কথা

কিন্তু সবকিছু সবার বেলায় সুন্দর ভাবে শেষ হয় না। এই রাস্তা তৈরি করার সময় জায়গা অধিগ্রহণের কারণে রাস্তার আশেপাশের পাহাড়ি এলাকায় ম্রো জনগোষ্ঠীর ১৫০টি পরিবারের অন্তত ৫০০ জন লোক মায়ানমারে দেশান্তরিত হয়েছিল বলে শোনা যায়।

Walk off-trail আমাদের নতুন সিরিজ। ৬ পর্বের এই ব্লগ সিরিজে আমরা বাংলাদেশের ৬ টা অফট্রেইল ট্র্যাভেলিং এর ডিটেইলস জানব। এই ট্রিপগুলা মোটেও বহু প্রচলিত না। এদের কয়েকটা খুবই কঠিন, ভয়ংকর; কয়েকটা খুবই সহজ কিন্তু খুব আন্ডাররেটেড, কয়েকটা একদমই সিম্পল। কিন্তু সবগুলা ট্রিপই অসাধারণ এক্সাইটিং এবং বেশ সস্তা। আপনার যা লাগবে সেটা টাকা না, সেটা হচ্ছে ইনফরমেশন, আগ্রহ এবং ট্র্যাভেলিং এর নেশা।

প্রথম পর্ব: সদরঘাট থেকে সেন্টমার্টিন | পানিপথের চতুর্থ যুদ্ধ!

তৃতীয় পর্ব: সুন্দরবন | মৌয়ালদের সাথে একদিনের থ্রিলার

চতুর্থ পর্ব: হরিনাছড়া সোয়াম্প ফরেস্ট | পাহাড়ের গহীনে নতুন জলাবন

পঞ্চম পর্ব: রকেট স্টিমার সার্ভিস | ইতিহাস ঐতিহ্যে অন্যরকম নৌ-ভ্রমণ

ষষ্ঠ ও শেষ পর্ব: কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সাইক্লিং

1 thought on “থানচি থেকে আলীকদম | বাংলার রোড র‍্যাশ!”

Comments are closed.

Scroll to Top