fbpx

তাহিরপুর: ভীতু ফুয়াদের হাওর আগমন

Home » তাহিরপুর: ভীতু ফুয়াদের হাওর আগমন

“ফুয়াদ, একটা কাজ আছে, ঢাকার বাইরে।”

ছোট্ট করে একটা নিঃশ্বাস ফেললাম। কাজ থাকলে তো যেতেই হবে। পাস করার পরে সাত মাস বেকার থেকে একটি চাকরি পেয়েছি। চাকরির সুবাদে বেশ ঘুরাঘুরি করতে হয়। ঘুরি। খারাপ লাগে, তা না। তবে একা একা কোথাও যাওয়ার ব্যপারটা ঠিক সাহসে পাই না।  ঢাকায় জন্ম, ঢাকায় বড় হওয়া। দাদাবাড়ি-নানাবাড়ি ছাড়া আর কোথাও যাইও নাই কোনদিন। সেটাও তো আর একা না, অন্যদের সাথে। বুয়েটে পড়ে আমি কোন ট্যুর দেইনি, এই কথা বললে মানুষ কেমন অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকায়। তাই আমি বলা ছেড়ে দিয়েছি। একা একা কোথাও যাওয়ার বেশ কিছু সমস্যা আছে। ছেলেধরা ধরতে পারে। ধরে নিয়ে ইন্ডিয়াতে বিক্রি করে দিতে পারে। এত কষ্ট করে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস দিয়ে শেষে ছেলেধরার পাল্লায় পড়াটা বিশেষ উৎসাহব্যঞ্জক মনে হয় না। বিয়েশাদি করা হয়নি। এই অবস্থায় ইন্ডিয়ায় বিক্রি হয়ে গেলে বিশাল লস। সাতমাস বেকার থেকে বেকার অবস্থায় রোজা এবং কোরবানি দুই ঈদ পার করার পর এখন আমি চাকরি ছাড়তে বিশেষ উৎসাহ পাই না। কোথাও যাওয়ার কথা হলে আমি কোন কারন ছাড়া ডেট পেছানোর চেষ্টা করি। গাইগুই করি। শেষে মন খারাপ করে রওনা দেই। সে যাই হোক, এবারের গন্তব্য সুনামগঞ্জের কোন এক চিপায়। জায়গা নাকি সুন্দর। আমি বিশেষ আগ্রহ পাচ্ছি না। আগের দুই একটা সফর থেকে বুঝে ফেলেছি, কাজে গেলে ঘোরার মজাটা থাকে না।

কোথাও যাওয়ার আগে আমি বিস্তারিত তথ্য নেই। বাসা থেকে রিকশা নেব, কোথায় গিয়ে নামব, তারপরে কোন বাসে উঠবো, কোন সিট ভাল, কতক্ষণ লাগবে, কোথায় নামব, তারপরে কি, তারপরে কি, তারপরে কি… সবকিছু জেনে রওনা দেই। কোথাও যাওয়ার নাম হলে আমি অফিসে জনে জনে বলি, “ভাই, অমুক যায়গায় যাচ্ছি, কি বিপদ, দেখেন তো!” । বেশির ভাগ লোক বিরক্ত হয়, দুই একজন ছাড়া। সুনামগঞ্জে যাওয়ার কথা শুনে আমি যথারীতি মুখ কালো করে ঘুরে বেড়াচ্ছি, কারো অভয়ে কাজ হচ্ছে না। যাকে পাই, তাকেই শুনচ্ছি, “ভাই কি একটা অবস্থা, দেখেন কই কই পাঠায়”।

সুনামগঞ্জের যেখানটায় যাব, জায়গাটার নাম তাহিরপুর। সেখানে বিদ্যুৎ নাই। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে একটা গবেষণা প্রকল্পের আওতায় তাহিরপুর বাজারে সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা করে কিছু দোকানে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছে। এই জিনিস দেখতে যেতে হবে। কোন মানে হয়? তাহিরপুর জায়গাটা টাঙ্গুয়ার হাওরের মাঝে। ছোটকালে বাসায় যখন ডিশের লাইন ছিল না, যখন বিটিভি দেখতাম সকাল থেকে রাত পর্যন্ত, তখন টাঙ্গুয়ার হাওড়ে অতিথি পাখি আসে, এরকম একটা কিছু আমি টিভিতে দেখেছি। পাখি দেখার কিছু নাই। ঢাকায় প্রচুর কাক। প্রচুর কাক দেখেছি, পাখি দেখা সম্পন্ন হয়েছে।

তাহিরপুরের গুগল ম্যাপ
গুগলম্যাপে তাহিরপুর

ঢাকার বাইরে যাওয়ার জন্য ব্যাগ একটা সমস্যা। ক্লাস করতাম যেই ব্যাগ নিয়ে, সেটা ছিঁড়ে গেছে। বাসায় সবাই মিলে কোথাও গেলে “লাগেজ” নামে বিশাল একটা ব্যাগ নিয়ে যাওয়া হয়। আমি মাঠে ঘাটে ঘুরি। যেসব যায়গায় যাই, দুর্গম জায়গা, গাড়ি-ঘোড়া বিশেষ চলে না। বিশাল এক স্যুটকেস নিয়ে মোটর সাইকেলে করে একজনের পিছে বসা বিশেষ আনন্দের কোন কাজ না। ভেবে চিন্তে বিরক্ত মুখে ছোট ভাইয়ের স্কুলব্যাগ নিয়ে রওনা হয়েছি। সেও বেশ বিরক্ত হল। নিজে বিরক্ত, ছোট ভাইও বিরক্ত, কি একটা বিগার!

অফিসের কাজে বাইরে গেলে ভাল বাসের অ্যালাউন্স পাওয়া যায়। আমার পরিকল্পনা একটা ভাল এসি বাসে যাব, ঘুমাতে ঘুমাতে। ডিসেম্বর মাস, ঠাণ্ডা, তবে বিজনেস ক্লাস এসি বাসের যাত্রা আরামের। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যাব, সকালে পৌঁছে কাজ শেষ করে দুপুরের বাসে বিদায়। সুনামগঞ্জে ডিরেক্ট কোন এসি বাস নাই। আমার এত সাহস নাই যে ভেঙ্গে ভেঙ্গে যাব। খোজ নিয়ে জানলাম শ্যামলী পরিবহনের বাস যায় সুনামগঞ্জে। ভাড়া কম। আমার মন খারাপ হয়ে গেল। নন-এসি বাস, ৫০০ টাকা ভাড়া, ঢাকা টু সুনামগঞ্জ। রাত এগারোটায় বাস, ভোরে সুনামগঞ্জে নামিয়ে দেবে। আরামবাগ থেকে বাসে উঠতে হবে। এটা ভাল কথা। আরামবাগ মোড়ে ছিনতাইকারী ধরতে পারে, তবে জায়গাটা বাসার কাছে।

অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে রাত ৮ টা। আমি আর বেশি রাত না করে, পরিবারের সবার থেকে দোয়া নিয়ে, আগে আগে কাউন্টারে গিয়ে বসে আছি। ছিনতাইকারী ধরে নাই, লক্ষণ শুভ। বাসের জন্যে বসে আছি। বাস নাই। ভয় পাচ্ছি। এ কেমন কাউন্টার, যাত্রী নাই-কিছু নাই। খানিক্ষন পরে ছোট একটা কোস্টার মত বাস আসল, কাউন্টার থেকে ওটায় উঠতে বলল। আমি বুঝলাম না, এই বাসে সুনামগঞ্জ কেমন করে যাব! মতিঝিলের চিপাচাপা ঘুরে কোস্টার নিয়ে আসল সায়দাবাদ। এতক্ষণে বুঝলাম, এখান থেকেই আসলে বাসে উঠতে হত। যাক, বাস ছেড়ে দিল। একদম সামনের সিট। জানালা লাগিয়েও শীত ঠেকানো যাচ্ছে না। গেঞ্জি-হুডি পরে কান ঢেকে বসে আছি। একসময় ঘুমায়ে গেলাম।

ঘুম ভেঙ্গে দেখি বাস থেমে আছে। ব্রেক। শীতকালে ব্রেক জরুরী বস্তু। সিলেট-সুনামগঞ্জের দিকে গেলে এই একটা জায়গায় বাস থামাবেই। উজান-ভাটি রেস্টুরেন্ট। দুইটা তলা। নিচতলাটা নরমাল, হাউকাউ-কাউকাউ। উপরের তলাটা একটু এক্সক্লুসিভ গোছের। নিরিবিলি ঠিক না, তবে পরিবার নিয়ে বসার মত। ওয়াশরুমগুলোও তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার। ক্ষুধা ছিল না। ফ্রেশ হয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে শীতে কাঁপছি, ভাল লাগছে বেশ। মেজাজ খারাপের ভাবটা কমে এসেছে। বাস ছেড়ে দিল। ঘুমাতে চাইলাম, কিন্তু কোন এক ফাঁকফোকর দিয়ে ঢোকা শীতের বাতাসে ঘুমানো বেশ কষ্টকর হয়ে দাঁড়াল। আগের দিন অফিস করেছি, ক্লান্ত ছিলাম, তাও সারারাত ছাড়াছাড়া ঘুম হল।

সুনামগঞ্জ এর গুগল ম্যাপ
গুগলম্যাপে ঢাকা থেকে আমার গন্তব্যস্থান

ভোরের দিকে কন্ডাকটরের হাঁকডাকে ঘুম ভেঙ্গে গেল। বড় ব্রিজের কাছে এসে গেছি। আমি যেই জায়গাটায় যেতে চাই, সেখানে যেতে হলে বড় ব্রিজে নামতে হবে। নামলাম। এখানে নেমে প্রথম যে অনুভূতি হল, সেটা হচ্ছে, “খাইছে”। ব্রিজটা অনেক উঁচু। তখন ডিসেম্বর মাস, নিচে পানি ছিল বলে মনে হয় না, নিচের মাটির লেভেল থেকে কম করে হলেও দশ তলা উঁচু হবে ব্রিজটা। রাস্তার দুইপাশে নিচু জমি। আর হাতছোয়া দূরত্বে পাহাড়। এ কোন পাহাড় আমি জানি না। আমি এর আগে পাহাড় দেখি নাই। পাহাড় ব্যপারটা এত ব্যাপক হতে পারে, আমার ধারণাতেও ছিল না। সকালে কোথায় নাস্তা করেছিলাম, আদৌ করেছিলাম কি না, আমার এখন মনে নেই। আশেপাশের দৃশ্য এমনভাবে মনকে নাড়া দিয়ে গেল, এসব ব্যপার মনে না থাকাই স্বাভাবিক। বড় ব্রিজ থেকে তাহেরপুর যাবার একমাত্র উপায় মোটরসাইকেল। ব্রিজের উপরেই অনেক মোটরসাইকেল পাওয়া যায়। একটু দরদাম করে নিতে হয়, তবে ৩০০-৪০০ টাকার মধ্যেই হওয়ার কথা।  মজার ব্যপার হল, এখানে দেখলাম সব মোটর সাইকেল একই মডেলের – হিরো হোন্ডা। এরা কোত্থেকে একই মডেলের এত মোটর সাইকেল যোগাড় করেছে কে জানে।

বড় ব্রিজ থেকে মোটর সাইকেলে করে সাঁই সাঁই করে নামার যে অনুভূতি, এর সাথে রোলার কোস্টার রাইডের একটা মিল পাওয়া যায়, সাথে পাহাড়ি বাতাস ফ্রি। নাগরদোলায় উঁচু থেকে নামার সময়ে যেই অনুভূতিটা হয়, সেরকম, তবে দীর্ঘস্থায়ী। আমি নরমাল একটা ফুল হাতা গেঞ্জির উপরে হুডি পরা। মনে হচ্ছিল ঠাণ্ডা বাতাস দুই প্রস্থ কাপড় ভেদ করে হাড়ে গিয়ে ঠেকছে। মুখের যেটুকু অংশ খোলা, সেখানে বাতাস সূচের মত ফুটছে। আর দুই হাতে কোন সাড়া পাচ্ছি না। চলন্ত অবস্থাতেই নেটে চেক করে দেখলাম , ৬ ডিগ্রী সেলসিয়াস। ঢাকাতে ১০ এর কম কোনদিন দেখিনি, তাও আবার যেদিন ১০ এ নামবে, সেদিন হ্যারি পটার ওয়েদার হবে, কুয়াশা, অন্ধকার। এখানে মজার ব্যপার, হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা, কিন্তু আবহাওয়া পরিষ্কার। দূরের সবকিছু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। মুখ অবশ হয়ে যাচ্ছিল, ব্যাগ থেকে গামছা বের করে মুখ ঢেকে নিলাম। মোটর সাইকেলের ড্রাইভারের যতটা সম্ভব কাছ ঘেঁষে বসলাম, শরীর থেকে কিছু ওম যদি পাওয়া যায়। আরাম পেয়ে ব্যাটা আরও জোরে টান দিল।

বড় ব্রীজ, মল্লিকপুর, সুনামগঞ্জ এর গুগল ম্যাপ
গুগল ম্যাপে বড় ব্রীজ, মল্লিকপুর
বড়ব্রীজ সুনামগঞ্জ থেকে জাদুকাটা নদী পর্যন্ত বাইক ভ্রমণ
লোকাল ডাকাত বেশে আমার বাইক ভ্রমণ

রাস্তার দুইপাড়ের সিন সিনারি দেখতে দেখতে যাচ্ছি। রাস্তার থেকে এক হাত নিচেই জমি। ফুলকপি, বাঁধাকপি স্তুপ হয়ে আছে। এত তাজা, সাইকেল থেকে নেমে কচকচ করে চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে। মাঝে মাঝে খানাখন্দ। তার মধ্যে দিয়ে পানির ধারা। মোটর সাইকেল থেকে নামতে হয়না, তবে পা উঁচু করে রাখতে হয়। নাহলে পা ভিজে যাওয়ার বিরাট সম্ভাবনা। মোটর সাইকেল ওয়ালা এক্সপার্ট, বেশ পার করে নিচ্ছে। পাহাড়গুলো দেখে মনে হচ্ছিল হাত দিয়ে ছোয়া যাবে, এত কাছে। আধা ঘণ্টার উপরে রওনা হয়েছি, এখনো মনে হচ্ছে দূরত্ব একই, বুঝলাম না। কিছুদূর যাওয়ার পরে দেখলাম রাস্তার দুইপাশে রেললাইন এর মত। আশেপাশে পরিত্যক্ত ক্যারেজ, ক্রেন। মনে পড়ল, সুনামগঞ্জ বাংলাদেশের সিমেন্ট শিল্পের একটা হাব। এদিকে প্রচুর চুনাপাথর পাওয়া যেত। এসব সিমেন্ট কারখানা, বা চুনাপাথর উত্তোলন শিল্পগুলো এখন বাংলাদেশের শিল্প মন্ত্রণালয় দেখলেও, এসব এস্টাবলিশমেন্ট ব্রিটিশ আমলে তৈরি। গা শিরশির করে উঠল। মনে হচ্ছিল কোন সিনেমার সেটে চলে এসেছি। সবুজ মাঠ, এর মধ্যে কাচা রাস্তা, দুইপাশে পরিত্যক্ত দালান-কোঠা, ভারি যন্ত্রপাতি। মজার ব্যপার হল, এই জায়গাটা ঢাকা থেকে দূরে হলেও ভারতের আসামের একদম কাছে। বুঝতে পারলাম, এই অংশের যোগাযোগ আসলে ওদিকের সাথেই ভাল ছিল।

কিছুদূর গিয়ে একটা খালের মত পড়ল, পার হতে হবে। ফেরি বলতে কিছু নেই। ট্রলার টাইপের বড় নৌকায় করে পার হতে হবে। পাটাতন বিছানো থাকে। মোটরসাইকেল আরামসে উঠে যায়। তবে এই ভাড়া আপনাকে গুনতে হবে।

বারিকটিলা, জাদুকাটা নদী, সুনামগঞ্জ
জাদুকাটা নদীর সামনে মাঞ্জা মেরে একটা ছবি তুলে ফেললাম

খাল পার হয়ে কিছুদূর গিয়ে হঠাৎ মনে হল মরুভূমিতে চলে এসেছি। বিশাল বিস্তৃত মাঠে কেবল মোটা দানার বালি আর বালি।মোটর সাইকেল চলতে চায় না। সামনে পানি। বুঝতে পারলাম, জায়গাটা রিভার বেড। মানে এখানে বর্ষায় পানি থাকে। নদীর পানি স্বচ্ছ। নিচের পাথর, বালি সব দেখা যাচ্ছে। পানির রং গাঢ় নীল।  হাতছোয়া দূরত্বের পাহাড় মনে হল নিশ্বাস ফেলার দূরত্বে চলে এসেছে। আমার মনে হচ্ছে এই নদী এই পাহাড় থেকে তৈরি হয়েছে। আমি জানতাম পাহাড় সবুজ হয়, কিন্তু এখানে পাহাড় কেমন যেন নীলচে । নদীর পাড়ে সারি সারি নৌকা বাধা। ভয়ংকর সৌন্দর্য। ভয়ংকর এই অর্থে, এই নদী দেখার সাথে সাথে সেখানে ঝাপ দিতে ইচ্ছা করবে। আমি অস্থির টাইপের ছেলে। সবসময় কিছু নিয়ে টেনশনে থাকি। টেনশনের কিছু না থাকলে কেন টেনশনের কিছু নেই, সেটা নিয়ে টেনশন করি। এই জায়গায় এসে মনে হল, আমার কোন টেনশন নাই। জীবনটা আসলে এই নদীতে। মাত্র ১০ ঘণ্টা আগে যেই কোলাহল ছেড়ে আমি এসেছি, তার কিছু আমার মাথায় নাই। একদিন পরে যেই জীবনে আমি ফেরত যাব , তারও আসলে কোন গুরুত্ব নাই। ওই মুহূর্তটা সত্যি। ওই নদীটা সত্যি। নদীর পানি সত্যি। ওই পাহাড়টা সত্যি। ওই মুহূর্তটায় আমি বেঁচে আছি, এটা সত্যি। হুট করে আমার মনে হল, জীবন নিয়ে এত চিন্তার আসলে কিছু নাই। জীবন কোন না কোনভাবে আসলে পার হয়েই যায়…

নদী পার হয়েই একটা উঁচু টিলা।অনেক খাড়া। টিলার গায়ে সিমেন্টের সিঁড়ি করে দেওয়া আছে। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। আর পাশে রাস্তার মত করে দেওয়া আছে, মোটর সাইকেল ওখান দিয়ে ওঠে। উপরে উঠে দমবন্ধের অনুভূতি হল। পাহাড় আর নদীর পুরো ভিউ পাওয়া যাচ্ছে। পাহাড়টা ভারতের ভাগে পড়েছে, নদীটা আমাদের। আমার খুব একটা গ্যাজেট প্রীতি নেই। তবে ওই মুহূর্তে একটা ভাল ক্যামেরার প্রচণ্ড অভাব-বোধ করলাম। পুরানো মোবাইল ফোনই সই, মোবাইল দিয়ে যা পারলাম কিছু ছবি তোলার চেষ্টা করলাম।

*এখান থেকে ঘুরে আসার অনেক পরে ফেসবুকে ছবি দেখে জানতে পারি, নদীর নাম ছিল জাদুকাটা নদী, আর টিলার নাম ছিল বারিক টিলা।

সারি সারি নৌকা, জাদুকাটা নদী, সুনামগঞ্জ
নদীতে বেঁধে রাখা সারি সারি নৌকা
তাহিপুরের পাশে জাদুকাটা নদী, সুনামগঞ্জ
রোঁদে চিকচিক করা পরিস্কার টলমলে পানি

জাদুকাটা নদী পার হয়ে আবার যাত্রা শুরু। এবার বেশ কিছু টিলা পার হতে হবে। মোটর সাইকেলে চড়ে ওঠা যাবে না। নেমে হেটে উঠতে হয়। আর সাইকেল ওয়ালা সাইকেল নিয়ে টিলার উপরে উঠে যাবে। সেখান থেকে সাইকেলে চড়ে নাগরদোলার ফিলিংস নিয়ে নামতে হবে। পথে বেশ কয়েকটা টিলা পড়বে। পায়ে হেটে উঠলেও টিলার উপরের দৃশ্য নয়নাভিরাম। অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। রাস্তার পাশে বিজিবির ক্যাম্প দেখলাম। ঢাকায় বসে আসলে বোঝা যায়না, ঢাকার বাইরেও একটা পৃথিবী আছে। এখানে যারা ডিউটি করছে, তাদেরও পরিবার আছে। পরিবার পরিজন ছেড়ে কোথায় এসে মানুষগুলো ডিউটি করছে। শ্রদ্ধা চলে আসল। প্রায় ৩-৪ ঘণ্টা পরে তাহেরপুর বাজারে পৌছুলাম।

তাহিরপুর বাজারটা ছোট্ট, গ্রাম্য বাজার। বাজারের পিছন দিয়ে সাপের মত একেবেকে নদী চলে গেছে। বাজারে ৫০-৬০ টার  মত দোকান, একটা মসজিদ। পাশেই প্রাইমারি স্কুল। এক জায়গায় নদীটা ইউ (U) এর মত। মানে ওই কোনাটায় দাঁড়ালে দুই পাশে নদী। ওখানে যেতে হলে নৌকা করে যেতে হয়। একটা নৌকা ঠিক করলাম। নিজেই চালাব। কষ্ট হয়, তবুও চালাব। তবে মাঝিকে ছাড়া একা রওনা না দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। নৌকা চালিয়ে ইউয়ের পেটে ঢুকে গেলাম।

নৌকা ভ্রমণ, তাহিরপুর, সুনামগঞ্জ
আমি প্রেমের ঘাঁটের মাঝি!
শ্রীপুর বাজার, তাহিরপুর, সুনামগঞ্জ এর গুগল ম্যাপ
গুগল ম্যাপে শ্রীপুর বাজার, তাহিরপুর

স্থানীয় মানুষজন খুব ভাল। এক বাচ্চার সাথে খুব খাতির হয়ে গেল। সে সাথে করে চারপাশ ঘুরিয়ে দেখাল। স্কুলটা দেখে মনে হল কম করেও একশ বছর আগের। স্কুলের ছুটি হয়েছে। বাচ্চাদের কিছু ছবি তুলতে ইচ্ছা হল। ছবি তোলার কথা শুনেই বাচ্চারা খুব খুশি, নিজেরাই এসে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। শুধু ছোট্ট একটা সমস্যা, বাচ্চাদের হাউকাউয়ে স্কুলের হেডস্যার ক্ষেপে গেলেন, অতঃপর তিনি তেড়ে এলেন। বাচ্চারা যে যেদিকে পারে দৌড়, আমিও দৌড় দিব কি না ভাবছি, পরে নিজের বয়স চিন্তা করে দিলাম না। উনি এসেই আমাকে নানান জিজ্ঞাসাবাদ, আমি কে, কোত্থেকে এসেছি, কি কাজ। অনুমতি না নিয়ে বাচ্চাদের ছবি তোলার ব্যপারটা স্যারের একদম পছন্দ হয় নাই। মনে হল, খবর আছে। নানান বুঝ দিয়ে সে যাত্রায় রক্ষা পেলাম। শিক্ষা হল, কোথাও গিয়ে স্থানীয় মানুষদের রীতিনীতি না বুঝে পাকনামি করতে হয় না।  

কাজ সারতে প্রায় বিকেল হয়ে গেল। একই মোটর সাইকেলে চড়ে রওনা দিলাম। আমার মন খারাপ হয়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু কোন এক আশ্চর্য কারণে মনটা অদ্ভুত হালকা হয়ে আছে। শেষ বিকেলে জাদুকাটা নদীতে অস্তগামী সূর্যের আলো পড়েছে। পাথর বোঝাই একটা ট্রলার পানিতে ডুবিডুবি করছে। আমি তাকিয়ে আছি…

বড় ব্রিজের কাছে পৌছাতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। অন্ধকার হয়ে গেছে। মনটা খুব উদাস। বাস ধরে আমার ঢাকায় ফেরার কথা। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, ফিরব না। পাশেই সিলেট, সেখানে চলে যাব। সে আরেক গল্প, থাক…  

2 thoughts on “তাহিরপুর: ভীতু ফুয়াদের হাওর আগমন”

Comments are closed.

Scroll to Top