fbpx

সিলেট: আমার ক্লান্ত সন্ধ্যের শহর

সুনামগঞ্জ থেকে সিলেট একদম কাছে। পাশের জেলা। তাহিরপুর ঘুরে আসার ঘোর তখনো কাটেনি। আমার ঢাকায় ফেরার কথা। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম ফিরব না। সিলেটে চলে যাব। এর দুটি কারণ। এক, আমার ঢাকায় ফিরতে ইচ্ছা করছে না। দুই, আমার সারা শরীর ব্যথা।

আগের দিন অফিস করেছি। রাতে শীতে কাপতে কাপতে বাসে জার্নি করে ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ গিয়েছি। সকালে ৩ ঘণ্টা মোটরসাইকেলের পিছনে বসে তাহিরপুর গিয়েছি। এবং কাজ সেরে বিকালে আবারো ৩ ঘণ্টা মোটর সাইকেল যাত্রা করে বড় ব্রিজের কাছে ফিরে এসেছি। শরীর ব্যথা। মন উদাস। কোন কিছুই পাত্তা দিতে ইচ্ছা করছে না। সন্ধ্যা হয়ে গেছে।

সিলেটে কোথায় যাব, কোথায় থাকব কিছুই জানি না। সাস্টে ভাই-ব্রাদার আছে। থাকার সমস্যা হওয়ার কথা না। তবে আমার কারো কাছে যেতে ইচ্ছে করছে না। একা একা ঘুরতে ইচ্ছা করছে। নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা। নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়াটা আমার কাছে সবসময়ই খুব আন্ডাররেটেড একটা ব্যাপার বলে মনে হয়। সুযোগ পেলে মাঝে মাঝেই নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া উচিত।

সুনামগঞ্জের বড় ব্রিজের উপরে এসে মনে পড়ল সারাদিন তেমন কিছু খাইনি। এই সন্ধ্যায় খাবার পাওয়া মুশকিল। ছোটখাটো কিছু হোটেল পাওয়া গেল, রাস্তার উপরে। খাবার বলতে পুরি আর আলুর চপ। পাশেই একটা চায়ের দোকান। চা খেতে ইচ্ছে করছে যতটা, তারচেয়ে বেশি আমার এই রাস্তার পাশে কিছুক্ষণ নিরিবিলি বসতে ইচ্ছে করছে। চা নিয়ে দোকানের ছোট্ট বেঞ্চটাতে বসে আছি। একটা কুকুর পাশে রাজ্যের আলস্য নিয়ে শুয়ে আছে। চা খেতে খেতে উদাস হয়ে যাবার ইচ্ছা। চা শেষ করে উঠে দাঁড়ালাম। বিল দিলাম। ফিরতে হবে…

সাধারণত এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যাওয়ার জন্যে সবচেয়ে ভাল বাস খুঁজি। তবে এই মুহূর্তে কোন কিছু গায়ে লাগছে না। লোকাল একটা বাস পেলাম। প্রতি ঘণ্টায় সিলেটে যায়। ডিসেম্বরের ঠাণ্ডা আবহাওয়া। সুনামগঞ্জের সবুজ প্রকৃতি। আমি লোকাল বাসে উঠে গেলাম। ভাড়া কম। ১০০ টাকা হবে।

আমার পুরানো ফোন। একদিন পুরা চার্জ থাকে না। আমি একবার এক চার্জে মনপুরা ঘুরে এসেছিলাম, সে অন্য গল্প। এবার সুনামগঞ্জে যাবার আগে ৫০০০ মিলি অ্যাম্পিয়ার আওয়ারের একটা পাওয়ার ব্যাঙ্ক কিনেছি। জিনিসটা পাতলা। প্যান্টের পকেটে একই সাথে ফোন আর পাওয়ার ব্যাঙ্ক রাখা যায়। আমার ফোনে ফুল চার্জ। জিনিসটা যে কত শান্তির, মধ্য মেঘনায় ফোনের চার্জ শেষ হওয়ার ভয়ে ফোন বন্ধ করে রাখা লোক ছাড়া সেটা কেউ বুঝবে না। হেডফোনে গান শুনতে শুনতে যাচ্ছি। ঠাণ্ডা বাতাস ছেড়েছে। বাসটা মোটামুটি ফাঁকা। পাশের সিটে ব্যাগ রেখে আরামে যাচ্ছি।

সুনামগঞ্জ থেকে সিলেটের যাত্রা খুব ছোট। লোকাল বাসে দেড়-দুই ঘণ্টার মত। সিলেটে শেষ গেছি ছোটকালে। আব্বু-আম্মুর সাথে। ঢাকা থেকে। কোথায় নামতে হবে আমি জানি না। আমাকে যেখানে নামিয়ে দিল, আমি সেখানে নেমে গেলাম। গুগল ম্যাপে শহর দেখা যায়। কিন্তু কোথায় যাব, সেটা আমিও জানি না…

যে যায়গাটায় নামলাম সেটা নতুন বাস-স্ট্যান্ড। শহরের বাইরে। সুনামগঞ্জের লোকাল বাস নাকি এর পরে আর যায় না। আশেপাশে প্রচুর সিএনজি। আমার খেতে হবে। হোটেল খুঁজতে হবে। তবে তার আগে ঢাকায় ফেরার বাসের টিকিট কাটতে হবে। আমার ধারণা সকালে বের হলেও টিকিট পাওয়া যাবে, তবে রিস্ক নিতে চাচ্ছি না। গুগল করে দেখলাম গ্রিন লাইন বাসের কাউন্টার কোথায়। ম্যাপে একটা যায়গা দেখাল, শেয়ারের সিএনজি সেখানে যাবে কি না বুঝতে পারছি না।

সত্যি বলতে এই সিএনজি কোথায় যাবে, তাও আমার পরিষ্কার ধারণা নেই। উঠে পড়লাম। আমার পরিকল্পনা, সিএনজি যেখানে খুশি যাক। আমি শহরের বাইরে, ভিতরে ঢুকতে পারলেই হবে। সেখান থেকে কোন একটা ব্যবস্থা হবে। সিএনজি নানা অলিগলি ঘুরছে। ম্যাপে দেখছি, সাস্ট পার করলাম। সিলেটে মেডিকেল পার হয়ে একটা বড় ব্রিজের আগে নামিয়ে দিল।

অন্ধকারে বুঝতে পারছি না যায়গাটা কোথায়, তবে বেশ বড় ব্রিজ, আর জায়গাটা জমজমাট। আমাকে ব্রিজের ওপারে যেতে হবে। ওপাশে কাউন্টার। ভারী ব্যাগ কাঁধে নিয়ে হাটতে ইচ্ছে করছে না। হঠাৎ লক্ষ করলাম, ব্রিজ পার হবার জন্যে সিএনজি ডাকছে। উঠে বসলাম। ব্রিজটা ভীষণ বড়। পার হতে সময় লাগে। ব্রিজ পার হয়ে এপারে সামনেই কাউন্টার। পরের দিন সকাল নয়টার টিকিট করে নিলাম। এবার হোটেল খুঁজতে হবে।

টিকিট কেটে বের হয়ে আবার সিএনজি নিয়ে বড় ব্রিজটা পার হলাম। এবার নামটা চোখে পড়ল। কিন ব্রিজ। আমার মনে পড়ল, বেশ কবছর আগে বাংলালিংকের বিজ্ঞাপনে সারা দেশের নানান জায়গার ছবি দেখিয়ে বলত, “বাংলালিঙ্কড”। সিলেটের কিন ব্রিজের সামনে দাঁড়িয়ে কে যেন বলত, বাংলালিঙ্কড। বুঝলাম, ব্রিজটা সিলেটের ল্যান্ডমার্ক। এপারে এসে একটা রিকশা নিলাম। আমার গন্তব্য মাজারের কাছাকাছি একটা জায়গা। নেটে  দেখেছি ওখানে একটা সরকারি/সেমি-সরকারি রেস্ট হাউজ টাইপের আছে। এই রেস্ট-হাউজগুলো ভাল হয়। ভাড়া কম, বড় রুম।

অচেনা শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি। ক্লান্ত শরীর, তবে আমার বেশ ভাল লাগছে। একা একা ঘোরার মজা অন্যরকম, টের পাচ্ছি। ইচ্ছে হলেই আমি রাস্তার পাশে থেমে একটা ছবি তুলতে পারি। ইচ্ছা করলেই রিকশাওয়ালাকে আস্তে চলতে বলতে পারি। রিকশাওয়ালার সাথে গল্প করতে করতে গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম। রেস্ট-হাউজ খুঁজে পেলাম। কপাল খারাপ। সিঙ্গেল রুম নেই। ডাবল রুম আছে, তবে ভাড়া বেশি। অফিস থেকে যে হোটেল ভাড়া পাই, তার একটা সিলিং আছে। এই রুম আমার কপালে নেই, ভাড়া বেশি। বের হয়ে গেলাম। এবার আর রিকশা নিলাম না।

আশেপাশে প্রচুর হোটেল। তবে বেশিরভাগের ভেতরেই ঢুকতে ইচ্ছে হল না। কিছু বেশি দামী মনে হল, আর কিছু থাকার মত না। গুগলে এই একটা সুবিধা আছে, মিনিমাম কত টাকা থেকে রুম ভাড়া শুরু হয়, সেটা “হোটেলস নিয়ার-বাই” তে দেখিয়ে দেয়। খুঁজতে খুঁজতে মাজার পার হয়ে একটু সামনে একটা হোটেল পেলাম। নিরিবিলি একটা গলির মধ্যে। হোটেলের নামটা মজার। “হোটেল হিলটাউন”। আমি হিলটন হোটেলের নাম শুনেছি, হিলটাউনের নাম শুনিনি। ঢুকে গেলাম।

নিচতলায় অদ্ভুত লাইটিং। পুরো নীল হয়ে আছে। মানুষ জনের দেখা নেই। দোতলায় রিসেপশন। ডিসেম্বর মাস। ট্যুরিস্ট সিজন। রুম আছে কি না কে জানে। আমার সারা দিনের ধুলো-ময়লা মাখা চেহারা দেখে এরা বিশেষ ভরসা পাচ্ছে বলে মনে হল না। জানা গেল , একটা রুম আছে, ভাড়াও লিমিটের মধ্যে। আমার আর কিছু জানার নেই। রুম দেখে তারপরে কনফার্ম করার নিয়ম। রুম দেখতে নিয়ে গেল পোর্টার। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙ্গে আসছে। না দেখেই রুম নিয়ে নিতাম। নিচে রিসেপশনে নেমে ফর্ম ফিলাপ করে ভাড়া মিটিয়ে দিলাম। যদ্দুর জানি, ভাড়া চেক-আউট করার সময় নেওয়ার কথা, আমি আর কথা বাড়ালাম না।

রুমে ঢুকে কাপড় না বদলে ওভাবেই শুয়ে পড়লাম। বেশ কিচ্ছুক্ষণ ওভাবে পড়ে থেকে উঠলাম। ক্ষুধা পেয়েছে। এই অবস্থায় বাইরে যাওয়া সম্ভব না। গোসল সেরে নিলাম। গিজার ছিল না। কিছু করার নেই। ঠাণ্ডা পানিই সই। গোসল সেরে আমি আবিষ্কার করলাম, আমি কোন স্যান্ডেল নেইনি। ট্রাউজার, হুডি আর স্নিকার পরে নিচে নেমে এলাম। খেতে হবে। ম্যাপে দেখলাম পাশেই হান্ডি রেস্টুরেন্ট। অনেক নাম শুনেছি। এদের হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি খুব বিখ্যাত। চেখে দেখার ইচ্ছা। রিকশা নিলাম। হান্ডিতে এসে দেখি, বিরিয়ানি শেষ। মন খারাপ হয়ে গেল। অন্য আইটেম আছে। খেতে ইচ্ছে হল না। নিয়ত করেছি হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি খাওয়ার, এটা যেহেতু হল না, অন্য কিছু খাব না।

বের হয়ে পাশেই দেখলাম আরেকটা হোটেল , পানসী। আমার মনে পড়ল, আগের সপ্তাহে আমার এক বন্ধুর ফেসবুক স্ট্যাটাসে আমি পানসীর নাম দেখেছি, খাবার নাকি অসাধারণ, আর খুব নাকি সস্তা। ঢুকে গেলাম। ভিতরে দুইটা অংশ। একটা বাইরে , উঠোনের মত একটা জায়গায়। আর একটা ভিতরে, ফ্যামিলি নিয়ে বসার জন্যে ভাল। আমার খোলামেলা জায়গা ভাল লাগে। বাইরেই বসলাম। বেশ জমজমাট। লাইভ কিচেন টাইপের। পাশেই রান্না হচ্ছে। নানরুটি, শিক কাবাব আর কোয়ার্টার গ্রিলের সাথে এক গ্লাস বোরহানী। খেয়ে আরামে ঘুম চলে এলো। রাত হচ্ছে, ঘুমও পাচ্ছে। সিলেট শহর ঘুরে দেখার ইচ্ছে বাদ দিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম।

রুমে ফিরে টের পেলাম, আমার প্রচণ্ড পিপাসা পেয়েছে। রুমে একটা হাফ লিটারের পানির বোতল ছিল, সেটা শেষ। আমি এর আগে হোটেলে বিশেষ থাকিনি। রুম সার্ভিস ব্যপারটার সাথে পরিচিত না তেমন। নিজেই নিচে নেমে দুই লিটারের একটা পানির বোতল কিনে নিয়ে এলাম। রাতে শুতে গিয়ে দেখি বিছানা ভর্তি বালি, কী ব্যাপার!!! এমন তো হওয়ার কথা না। কিছুক্ষণ চিন্তা করে বুঝতে পারলাম, সুনামগঞ্জ এর জাদুকাটা নদী তীরের বালু। প্যান্টের পায়ের কাছে ভাজে আটকে ছিল, রুমে ঢুকে গড়াগড়ি করার সময় বিছানায় পড়েছে। কী করার। চাদর সুদ্ধ টেনে ঝাড়ার চেষ্টা করলাম। বিশেষ সুবিধা হল না। একটা পাশ পরিষ্কার হল, ওপাশেই ঘুমব।

রুমে ছোট্ট একটা সনি টিভি। শুয়ে শুয়ে টিভি দেখতে গিয়ে একটা জিনিস মনে হল, আমি যে প্রোগ্রাম দেখছি, বাসার সবাইও আসলে ওই সময়ে একই প্রোগ্রাম দেখছে। কানেক্টেড ফিল করলাম খুব। লাইট বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম। লাইট বন্ধ করতেই হোটেলের বাইরের নরম আলো এসে ঘর ভরে গেল। বিছানা থেকে উঠে সোফায় বসে রইলাম কিছুক্ষণ, দূরে কোথায় যেন একটা বাচ্চা হাসছে…

এলার্ম দেয়া ছিল। সকালে সময়মতই ঘুম ভাঙল। রেডি হওয়ার কিছু নেই। বাসায় যাচ্ছি। রাতের কাপড়েই রওনা দিলাম। ট্রাউজার, গেঞ্জি, হুডি আর স্নিকার। এই হোটেলে নাস্তা খেতে ইচ্ছে করল না। কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট ছিল কিনা তাও মনে নেই। রিকশা নিলাম। কাউন্টারে যাব। বাস কাউন্টারে গিয়ে দেখি বেশ আগে চলে এসেছি। পাশেই একটা ছোট্ট হোটেল। গরম গরম পরোটা আর সবজী। ভালই। চা খেলাম। এরপর কাউন্টারে গিয়ে অপেক্ষা। বাস ছাড়ল সময়মতই। আগে আগে টিকিট কাটার সুবিধা পাচ্ছি। সিঙ্গেল রো তে সিট। একা একা রিল্যাক্স করে আসার ইচ্ছা। বাস ছেড়ে দিল।

ঢাকা সিলেট হাইওয়ে তে বাস চলছে। আসার সময় রাতে এসেছি। বিশেষ কিছু দেখতে পাইনি। এবার দেখতে পাচ্ছি। রাস্তার দুইপাশে একেবারে সবুজ। সাই-সাই করে বাস ছুটে চলেছে অচেনা পথে। বাসের জানালা সবুজ কাঁচের। ভিতরটা সবুজ হয়ে আছে। আমি তার উপরে সানগ্লাসটা পরে গা এলিয়ে শুয়ে আছি। ভীষণ আরাম লাগছে। চারপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে যাচ্ছি। রাস্তার পাশে ছোট্ট একটা টিনের ঘর। তারপরে একটা মাঠ। বাচ্চা একটা মেয়ে  মাঠের মধ্যে দিয়ে একটা ছাগল নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। দুটো ছোট্ট ছেলে ল্যাংকোট পরে সাঁকোর উপর থেকে নিচের খালে লাফিয়ে পড়ল। তা দেখে আরও ছোট একটা ছেলে লাফিয়ে হাততালি দিয়ে উঠল।

রাস্তার দুইপাশের দৃশ্যের সাথে স্মৃতিগুলো একে একে ছুটে আসছে। আবার দৃশ্য বদলে যাবার সাথে সাথেই চিন্তার সুতোগুলো কেটে যাচ্ছে। ভালই হচ্ছে, এক জিনিস নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবতে নেই। জট লেগে যায়। নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ছে। রাস্তার দিকে তাকিয়ে থেকে কত অলস বিকেল কিচ্ছুটি না করে পার করে দিয়েছি।

ঢাকা-সিলেট হাইওয়েতে গাড়ি ছুটে চলেছে, আমি চোখ বুজে আছি…

Scroll to Top