fbpx

সাত গম্বুজ মসজিদ | এক নিঃসঙ্গ মুঘল পুরাকীর্তি

Home » সাত গম্বুজ মসজিদ | এক নিঃসঙ্গ মুঘল পুরাকীর্তি

১৬১৫ সাল, আহোম সম্রাজ্যের সাথে যুদ্ধে কোনভাবেই মুঘলরা পেরে উঠছিল না। এই অবস্থায় সম্ভবত একটি বিজয় তাঁদের দরকার ছিল। সেই বিজয় আসে আরাকানদের বিরুদ্ধে। আরাকানদের চট্টগ্রাম, থিরি থুধাম্মার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে শায়েস্তা খান তাঁর নাম রাখেন ইসলামাবাদ। ১৬৬৬ সালে এই বিজয়ের পর শায়েস্তা খাঁ রাজধানী ঢাকা কে সন্নিবেশিত করতে মন দেন। ধারণা করা হয় মোহাম্মদপুরে জনবসতির শুরু এই সন্নিবেশনকাল থেকেই বেশ বেগ পায়। পুরাতন ঢাকার সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসাবে যেমন টিকে আছে লালবাগ কেল্লা। লালবাগ কেল্লার সমসাময়িক স্থাপনার তালিকা করলে তালিকায় স্থাপনা রয়ে যাবে শুধু দুইটি। ধানমন্ডির মুঘল ঈদগাহ আর সাত গম্বুজ মসজিদ। সাত গম্বুজ মসজিদই মানুষের মুখে মুখে সাত মসজিদ হিসাবে পরিচিত হয়ে গিয়েছে সময়ের আবর্তে। উল্লেখ্য এ মসজিদের নির্মাতা সুবাদার শায়েস্তা খাঁ এর ছেলে উমাইদ খাঁ।

১৮০০ শতাব্দীর সাত গম্বুজ মসজিদ
১৮০০ শতাব্দীর সাত গম্বুজ মসজিদ

মোহাম্মদপুর, পুরাতন ঢাকার দূরে সরে থাকা আরেক সন্তান ?

মোহাম্মদপুরের অলিগলিতে আমার চলাফেরা প্রায় দেড় যুগের। মুক্তিযুদ্ধে বিহারী ক্যাম্পের অবস্থান, ফিজিক্যাল কলেজ এ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর টর্চার সেল আর মধ্যবিত্তের দোতলা-তেতলা বাসাগুলি গত শতকের ইতিহাস এর কত স্পর্শ বহন করে চলেছে তাঁর হিসাব আসলে কেউ জানে না। মোহাম্মদপুরকে বলা যায় ঢাকার প্রথম পরিকল্পিত আবাসন। কিন্তু মোহাম্মদপুরের ইতিহাস আসলে আরও অনেক অনেক পুরাতন।

১৯৫০ সালের সাত গম্বুজ এর সংগৃহীত ছবি
১৯৫০ সালের সাত গম্বুজ এর সংগৃহীত ছবি

মোহাম্মদপুরে নতুন সব বহুতল ভবন আর ৭০ এর দশকের লুপ্ত হতে থাকা শান্তিময় বাড়িগুলোর মধ্যে লুকিয়ে আছে মুঘল আমলের নিদর্শন। মোহাম্মদপুর অবশ্য পুরাতন ঢাকার মতই বদলে যাচ্ছে। ডেভেলপারদের বিশাল বিশাল বিল্ডিং জায়গা করে নিচ্ছে। কিন্তু এখনো অলি গলিতে ঢাকা শহরের এককালের ঘরোয়া স্কেল এর দেখা পাওয়া যাবে পুরাতন ঢাকার মত। সাথে মানুষের মোগলাই খাদ্যাভ্যাস। ছোট সরু রাস্তাঘাট আর গায়ে গায়ে লেগে থাকা বাড়ি সাক্ষ্য দেবে মোহাম্মদপুর পুরাতন ঢাকারই দূরে সরে থাকা সন্তান।

স্থাপত্যে সাত গম্বুজ মসজিদ

মসজিদ হিসাবে সাত গম্বুজ মসজিদকে বলা যেতে পারে নিতান্তই ছোট। আয়তাকার নামাজ-কোঠার বাইরের দিকের পরিমাণ দৈর্ঘ্যে ১৭.৬৮ এবং প্রস্থে ৮.২৩ মিটার। ভেতরে চার কাতারে একশত লোকের নামাজ এর ব্যবস্থা রয়েছে। পশ্চিম এর দেয়ালে তিনটি মেহরাব। আর পূর্বদিকের দেয়ালে তিনটি খিলান একই বরাবর।

সাত গম্বুজ মসজিদের নাম সাত গম্বুজ কেন এ নিয়ে আসলে খুব বেশি চমক নেই। এর ছাদে রয়েছে তিনটি বড় গম্বুজ এবং চার কোণের প্রতি কোনায় একটি করে অণু গম্বুজ থাকাতেই একে সাত গম্বুজ মসজিদ বলা হয়। এর মিনারের (turrets) সংখ্যা চারটি।

মুঘলদের সাথে স্থানীয় দ্রাবিড় বা আরাকানিদের স্থাপত্যের সবচেয়ে বড় পার্থক্য সম্ভবত চিন্তাধারার আকারে। মাত্র ১০০ জনের মসজিদের জন্য সামনে সুবিশাল উদ্যান, জ্যামিতিক সমতা আর লাল পাথরের অসাধারণ স্থাপত্যশৈলী। এটাই প্রমাণ করে মুঘলদের বিখ্যাত স্থাপত্যরীতির জাঁকজমক কতটা সুবিশাল ছিল।

তবে এই মসজিদ এর আসল চেহারাটা সম্ভবত এখন আর কোনভাবেই ফিরিয়ে আনার কোন উপায় নেই। অনেক বড় স্থপতিই বলেন, যে কোন স্থাপনা আসলে কতটা সফল তাঁর অর্ধেক ঠিক করে দেয় তাঁর স্থান ও কাল এর প্রাসঙ্গিকতা। কালের হিসাবে মুঘল স্থাপত্য হিসাবে সফলতা নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই এই মসজিদের ক্ষেত্রে । এর স্থাপত্যশৈলীতে মুঘল ঘরানার প্রভাব স্পষ্ট।

সাত গম্বুজ মসজিদ
সাত গম্বুজ মসজিদ

সাত গম্বুজ তাজমহল!

তবে স্থানীয় নির্মাণ উপকরণের সাথে মুঘল রীতির যে মেলবন্ধন লালবাগ কেল্লায় দেখা যায় তা নিঃসন্দেহে এখানেও দেখা যায়। এমনকি মুঘল প্রকৌশল এর ও কিছু অসাধারণ ছোঁয়া রয়েছে এই মসজিদে। এটি এখন বাইরে থেকে দেখে বোঝা না গেলেও আসলে দোতলার বুরুজগুলি নিজেরাই এক একটি স্বতন্ত্র ভবনের মতো।

তাঁদের ছাদ গম্বুজের কারণে ফাঁপা হলেও মেঝে সমতল। সেটার ওজন আবার নিচতলার মোটা দেয়ালে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে খুবই সুচতুর ভাবে। এর সাথে অলংকরণে মুঘলদের নিজস্ব প্যাটার্ন এর সাথে মেরলোন ধাঁচের কিছু অলংকরণ ও দেখা যায়। স্থানীয় অনেক প্রবীণ বাসিন্দা দাবী করেন তারা এই মসজিদটিকে দেখতে তাজমহলের মত হওয়ায় “তাজমহল” মসজিদ বলেই ডাকতেন।

সাত গম্বুজ মসজিদ এর অজানা সঙ্গী

সাতগম্বুজ মসজিদ থেকে জিগাতলা পর্যন্ত রাস্তাটার নাম এখনো পর্যন্ত সাত মসজিদ রোড। ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার একটি অংশ তৈরিই হয়েছে এই রাস্তাকে কেন্দ্র করে। মোহাম্মদপুর বাস স্ট্যান্ড পার হয়ে বাশবাড়ির পাশের ২০ ফিটের এক ছোট রাস্তা।

নিভৃতে পড়ে থাকা সেই রাস্তার গন্তব্য সাত গম্বুজ মসজিদ। একদম নিভৃতে বলা অবশ্য ভুল হল। এই মসজিদের একটি রহস্যময় সঙ্গী আছে। সেই সঙ্গী হচ্ছে একটি নাম না জানা সমাধি। সেই ২০ ফিট রাস্তার অন্য পাশে নিতান্ত অবহেলায় পড়ে আছে এই সমাধি। কেউ কেউ বলেন এটি শায়েস্তা খাঁর মেয়ের সমাধি।

কিন্তু মসজিদ এবং সমাধি কোনটির ই শিলালিপি বা ফলক আর যথাস্থানে নেই। তাই নিশ্চিত হবার উপায় নেই মসজিদ এর প্রতিষ্ঠার যথার্থ সাল বা সমাধির মাঝে শুয়ে থাকা নাম না জানা মানুষটির পরিচয় সম্পর্কে। তবে মসজিদের পাশে মুঘল আমলের না হলেও পরবর্তী সময়ে কিছু স্থানীয় মানুষকে কবর দেয়া হয়। মসজিদের সামনে বিস্তৃত বাগানটির এক অংশ এখনো কবরস্থান হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

সময়ের থাবায়….

কিন্তু সময় এমন এক নিয়ামক যেটা সাত মসজিদ এর স্থাপত্য-মূল্য কেড়ে নিয়েছে প্রায় নির্মমভাবে। ইতিহাস বলে এই মসজিদ নির্মিত হয়েছিল জাফরাবাদ গ্রামে,নাম না জানা এক নদীর তীরে। নদীটি বুড়িগঙ্গার সঙ্গে যুক্ত ছিল। মসজিদের সাথে নদীর ঘাট ছিল সে সময়। নৌকা ভিড়ত সেই ঘাটে।

সাত গম্বুজ এর সংগৃহীত ছবি
সাত গম্বুজ এর সংগৃহীত ছবি

বর্ষাকালে বড় বড় বজরা এসে ভিড়ত নদীর ঘাটে। পুরাতন ঢাকার নামজাদা পরিবারের সদস্যরা আসতেন নামাজ পড়তে। শুকনো মৌসুমে এরা আসতেন টম টম এ চড়ে। এই বর্ণনার সাথে মিল পাওয়া যায় চার্লস ডি ওয়াইলির ১৮১৪ সালে আকা মসজিদটির একটি স্কেচ এর। যেখানে মসজিদটিকে কিছুটা জরাজীর্ণ অবস্থায় দেখানো হয়েছে। তবে নদীর আকার ও মসজিদের স্কেল রীতিমত চমকে দেয়।

১৯৮৮ সালের বন্যাতে মসজিদের বেশ ক্ষতি হয়। পানি উঠে যায় মসজিদ প্রাঙ্গণে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে তখনো মসজিদটিকে অনেক দূর থেকে দেখা যেত। এমনকি স্থানীয়রা বলেছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরও অনেকদিন মসজিদের চারপাশ ঘেঁষে বিস্তৃত জলাধার ছিল। মিরপুর ব্রিজ এর উপর দাঁড়িয়ে তাকালে মসজিদটি আলাদাভাবে চোখে পড়ত। মসজিদের প্রবেশ এর জন্য একটি মাটির পথ ছিল মাত্র।

মসজিদের সাম্প্রতিক ছবি
সাত গম্বুজ মসজিদের সাম্প্রতিক ছবি

ঐতিহ্য রক্ষায় হতে হবে আরও মনোযোগী

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বেশ কিছুদিন হয় মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ এর দায়িত্বে আছে। মাঝে সাদা রঙ করে দেয়া হলেও পরবর্তীতে আসল রঙ ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। সমাধিটি অবশ্য সাদাই রয়ে গেছে এখনো। তবে নিকটবর্তী জায়গাগুলো আমাদের ভূমি-লালসা আর কংক্রিট গাথার ধ্বংসাত্মক স্বভাবের শিকার হয়ে যাওয়ায় মসজিদটি টিকে আছে প্রায় লুকিয়ে।

বিস্তীর্ণ নদীর বদলে মসজিদের লাগোয়া মাদ্রাসার বিশাল ভবন বা নতুন তৈরি হতে থাকা সুবিশাল আবাসন প্রকল্প মসজিদের স্কেল, স্থাপত্যের বিশুদ্ধতাকে অনেক আগেই গ্রাস করেছে। বর্তমান সময়ে কিছু স্থাপনাকে মসজিদের মালিকানাধীন এলাকায় ঢুকে পড়তেও দেখা যাচ্ছে। অথচ মুঘল এই মসজিদের মধ্যে নগরের গৌরব ও সামাজিক বনেদিয়ানার সবটুকু দিকনির্দেশনাই ছিল।

ঢাকা শহরে মসজিদ সামাজিক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারেনি এর অপরিকল্পিত আকার আকৃতি, বেঢপ ধরনের নকশা ও যথোপযুক্ত সামাজিক দিকনির্দেশনার অভাবে। প্রায় ৩৪০ বছর ধরে ঢাকার নগরায়নের সাক্ষী এই সাত মসজিদ।

হয়তো কোন একদিন মসজিদ এর হারানো সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার মত মানসিকতা ফিরে আসবে নগরবাসীর মনে। আশা রাখি সেইদিনের অপেক্ষায় মসজিদটি লুকিয়ে হলেও মানুষের আগ্রহ আর কৌতূহলের বিষয় হয়ে বেঁচে থাকবে।

সাত গম্বুজ মসজিদ যাবেন কিভাবে ?

ঢাকার মোহাম্মদপুর বাস স্ট্যান্ড এর ঠিক পাশেই অবস্থিত বিখ্যাত সাত গম্বুজ মসজিদ। আপনাদের সুবিধার্থে নিচে দিয়ে দেয়া হলো গুগল ম্যাপে এর সঠিক অবস্থান। তাছাড়া আরো বেশ কিছু ৩৬০° ছবিও দেখে নিতে পারেন সেখানে।

ওয়াকের চোখে ঘুরে দেখুন আরও কিছু ঐতিহ্যবাহী মসজিদ

Scroll to Top