fbpx

Walk off-trail এ আজকে শুরু করছি প্রথম পর্ব: সদরঘাট থেকে সেন্টমার্টিন।

ঢাকা সদরঘাট থেকে সেন্টমার্টিন যাব। কিন্তু পুরোটা যাব পানির ওপর দিয়ে। কি অবাক হচ্ছেন? জার্নিটা মোটেও পরিচিত না। এর কারণ জার্নিটা মোটেও সহজ না। বাংলাদেশের সবচেয়ে ইউনিক ফিচার হচ্ছে আমাদের নদী। বিদেশীরা আমাদের নদী দেখে ভাবে সাগর। অথচ আমরা এই নদীর কতটুকু উপভোগ করি?

উত্তর হচ্ছে শূন্য। আজকে আমরা নদী আর সাগরের মধ্যে দিয়ে এক অসাধারণ এডভেঞ্চারের প্ল্যান করব। আর এই এডভেঞ্চারের জন্য আপনার যা থাকা লাগবে তা হচ্ছে: সাহস, আগ্রহ এবং ডিটারমিনেশন। তো সবাই রেডি হয়ে যান, আমরা নৌকা ছেড়ে দিলাম!

অধ্যায় ১: সদরঘাট থেকে হাতিয়া

প্রতিদিন বিকাল ৫ টায় সদরঘাট থেকে হাতিয়ার উদ্দেশ্যে লঞ্চ ছেড়ে যায়। আর সেটি হাতিয়া পৌঁছে পরদিন সকাল ৭ টার মধ্যে। সদরঘাট থেকে চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর হয়ে লঞ্চটি হাতিয়া পৌছায়। মোট ১৪ ঘণ্টার জার্নি।

ভাড়া: ডেক – ৩৫০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন – ১২০০ টাকা, ডাবল কেবিন – ২২০০ টাকা।

লঞ্চঘাটেই যা যা দরকার সেরে নিতে হবে কারণ আমাদের পরবর্তী জাহাজ সকাল ১০ টায়।

অধ্যায় ২: হাতিয়া থেকে চট্টগ্রাম

হাতিয়া থেকে সকাল ১০ টায় চট্টগ্রাম এর উদ্দেশ্যে লঞ্চ ছেড়ে যায়। উঠে পড়েন। এই লঞ্চ আপনাকে সমুদ্রের মাঝখান দিয়ে সোজা চট্টগ্রাম পৌঁছে দেবে বিকেলের আগেই। রাতটা চট্টগ্রামেই কাটাতে হবে। বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাই একদম ফ্রি টাইম।

এই সময়টা চট্টগ্রামে আপনার বন্ধু বান্ধব থাকলে দেখা করে চিল করতে পারেন। পরিচিত কেউ না থাকলে লোকাল ফুড টেস্ট করতে পারেন। মেজবানি মাংস খেয়ে রাতে একটা ঘুম দেন।

অধ্যায় ৩: চট্টগ্রাম থেকে কুতুবদিয়া

পরদিন ভোর ৭ টায় আপনাকে কুতুবদিয়াগামী ট্রলারে উঠতে হবে। ট্রলার ছাড়ে চট্টগ্রাম সদরঘাট থেকে। ট্রলার চলতে শুরু করার ৩০ মিনিটের মধ্যে আপনি সমুদ্রে ঢুকে যাবেন। এভাবে সাগরের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে দুপুর ১ টা পর্যন্ত। চট্টগ্রাম থেকে আনোয়ারা হয়ে, মগনামাঘাট হয়ে দুপুর ১ টার দিকে আপনি কুতুবদিয়া পৌছাবেন।

মাছ ধরার কাঠের নৌকা নিয়ে জেলেরা সমুদ্রে যাচ্ছে। ছবি: রয়টার্স
মাছ ধরার কাঠের নৌকা নিয়ে জেলেরা সমুদ্রে যাচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

আজকের দিনটা আপনাকে এখানেই থাকতে হবে। এখানে থাকার মত মোটামুটি মানের একটাই আবাসিক হোটেল আছে। নাম হোটেল সমুদ্র বিলাস। সমুদ্রের ধারের এই হোটেলে বসে সাগরের বাতাস খেয়ে কিছুটা চিল করেন। হোটেলের ভাড়াও বেশ রিজনেবল। দুই জনের নন এসি রুম ভাড়া ৮০০ টাকা, তিনজনের ১০০০ এবং চার জনের রুম ভাড়া ১২০০ টাকা। রুম আগে থেকে বুক করতে চাইলে এই নম্বরে ফোনও দিয়ে রাখতে পারেন। নম্বর: ০১৮১৯৬৪৭৩৫৫, ০১৭২২০৮৬৮৪৭।

হাতে যেহেতু সময় আছে, কুতুবদিয়া ঘুরে দেখেন। প্রায় ২১৬ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের কুতুবদিয়া দ্বীপে বিদ্যুৎ সংযোগ নাই। জেনারেটর আর সৌর বিদ্যুৎ দিয়ে এখানকার ইলেক্ট্রিসিটির চাহিদা মেটানো হয়ে থাকে। দ্বীপটা বেশ সুন্দর। নির্জন সমুদ্র সৈকত, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র, লবণ চাষ, বাতিঘর, কুতুব আউলিয়ার মাজারসহ দেখার মতো অনেক কিছুই আছে।

অধ্যায় ৪: কুতুবদিয়া থেকে কক্সবাজার

পরদিন সকাল ৯ টায় আবারও ট্রলার ধরতে হবে। এবার গন্তব্য কক্সবাজার। মাতাবাড়ি, ঢালঘাটা হয়ে দুপুর ২ টার মধ্যে ট্রলার বড় মহেশখালী দ্বীপে চলে আসবে। নেমে গিয়ে চষে বেড়ান মহেশখালী আর সোনাদিয়া দ্বীপ। আর সময় বাঁচাতে চাইলে সরাসরি কক্সবাজার চলে যান।

শেষ অধ্যায়: কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন

শেষ অধ্যায়টাই সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। এবার আপনাকে মাছ ধরার ট্রলারদের সাথে দর কষাকষি তে নামতে হবে। কক্সবাজার থেকে যে সব ট্রলার গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যায়, তারা দুপুরের আগেই চলে আসে। এই সময়টা ওদের অবসর। যে কোন একটা ট্রলার সেন্টমার্টিন পর্যন্ত ভাড়া করে ফেলেন।

কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন ট্রলারে যেতে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা মিনিমাম লাগার কথা। সব ঠিকঠাক থাকলে রাত ৯ টা – ১০ টার দিকে আপনার সেন্টমার্টিন পৌঁছানোর কথা। আর জার্নির কথা বাদই দিলাম। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ এর কারণে জেলেদেরই প্রায় প্রতিদিন বমি হয়, আর আপনি তো সেদিনের কচি খোকা!

অবশ্য এত এডভেঞ্চার হজম না হইলে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বাসে চলে যেতে পারেন। কিংবা পুরোটা পথ সী বিচ দিয়ে সাইকেল চালায়ে গিয়ে টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনের জাহাজে উঠতে পারেন। কিন্তু এতদূর যেহেতু পুরোটা পানি পথে আসছেন, বাকিটুকুই বা বাদ যাবে কেন? একটু এডভেঞ্চার না হয় হোক!

এবার এক নজরে পুরো জার্নিটা গুগল ম্যাপে দেখে নেয়া যাক।

খরচ:

পুরো জার্নিটার খরচ ডিপেন্ড করছে আসলে আপনারা কয়জন একসাথে যাচ্ছেন তার ওপর। আমরা সাজেস্ট করবো ৮ থেকে ১০ জন হলে সবচেয়ে ইফেক্টিভ হয়। ১০ জনের বেশি হলে আপনারা হয়ত বিভিন্ন সময় পুরো ট্রলার ভাড়াও নিয়ে নিতে পারবেন।

যদি ৮ জনের বেশি মানুষ হয় তাহলে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত জনপ্রতি পৌছাতে সর্বোচ্চ ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ লাগার কথা। বিলাসিতা এভয়েড করলে আসলে ৩০০০ এর মধ্যেই সেন্টমার্টিন পৌছানো সম্ভব। এই টাকার মধ্যে যাওয়ার ভাড়া, মাঝে ২ দিন সাধারণ কোন হোটেলে নিজেরা নিজেরা থাকা এবং খাওয়া দাওয়াও ইনক্লুডেড।

এক্সট্রা খাতির!

এই রকম এডভেঞ্চারেও যারা খুশি না, যেই সব বীর বাঙালিদের জন্য আমরা একটা এক্সট্রা খাতির করতে চাই। খাতিরটা হচ্ছে একটা সাজেশন। কেরাণীগঞ্জ চলে যান। ঐখানে প্রচুর সওদাগর নৌকা আছে। এসব নৌকা বিভিন্ন রুটে মাল আনা নেওয়া করে। মাঝারি সাইজের এমন একটা নৌকা ভাড়া করেন। ১০ দিনের ছুটি আর ১০ জন বন্ধু ম্যানেজ করেন। আর সাথে ম্যানেজ করেন একজন দক্ষ সারেং যার বাংলাদেশের নদীপথে বহুদিন ট্রলার চালানোর অভিজ্ঞতা আছে।

এরপর নৌকা নিয়ে গুগল ম্যাপ ধরে সদরঘাট থেকে সেন্টমার্টিনের পথে রওনা দেন। অসংখ্য রুট আছে, আপনার যে যে শহর ধরে যেতে ইচ্ছা করে যান।

শাহ পরীর দ্বীপে মাছ ধরার কাঠের সাম্পান নৌকা। ছবি: জন স্ট্যানমেয়ার
শাহ পরীর দ্বীপে মাছ ধরার কাঠের সাম্পান নৌকা। ছবি: জন স্ট্যানমেয়ার

না হয় ১০ দিনের জন্য সিন্দাবাদ হইলেন। একদম সুস্থ অবস্থায় ঘরে ফিরবেন, সেই গ্যারেন্টি দিতে পারব না। তবে অন্তত ১০ বছর ঐ ১০ দিনের গল্প করতে পারবেন এই গ্যারেন্টি দিতে পারি।

কিছু টিপস!

  • মোবাইল নিতে ভুলে গেলেও সমস্যা নাই কিন্তু বমির ঔষধ সাথে নিতে ভুলেও ভুলে যাবেন না।
  • পানি পথে হিউমিডিটি অনেক বেশি থাকে। প্রচুর ওরস্যালাইন খাবেন।
  • পুরা রুটটা আসলে অনেক মানসিক আর শারীরিক শক্তি ডিমান্ড করে। প্রচুর পুষ্টিকর খাবার খাবেন।
  • টিমের সাথে ফার্স্ট এইড বক্স সাথে নিতে ভুলবেন না।
  • যদি বেশি অসুস্থবোধ করেন, ১-২ দিনের ব্রেক নেন। এরপর আবার শুরু করেন। মনে রাখবেন, এটা কোন কম্পিটিশন না।
  • নদীপথে সিকিউরিটি যে খুব ভালো তা কিন্তু না, সব সময় সাবধানে থাকবেন।
  • যত সম্ভব হালকা প্যাকিং করবেন। হাফ প্যান্ট আর ২টা গামছা অবশ্যই সাথে নিবেন।

Walk off-trail আমাদের নতুন সিরিজ। ৬ পর্বের এই ব্লগ সিরিজে আমরা বাংলাদেশের ৬ টা অফট্রেইল ট্র্যাভেলিং এর ডিটেইলস জানব। এই ট্রিপগুলা মোটেও বহু প্রচলিত না। এদের কয়েকটা খুবই কঠিন, ভয়ংকর; কয়েকটা খুবই সহজ কিন্তু খুব আন্ডাররেটেড, কয়েকটা একদমই সিম্পল। কিন্তু সবগুলা ট্রিপই অসাধারণ এক্সাইটিং এবং বেশ সস্তা। আপনার যা লাগবে সেটা টাকা না, সেটা হচ্ছে ইনফরমেশন, আগ্রহ এবং ট্র্যাভেলিং এর নেশা।

দ্বিতীয় পর্ব: থানচি থেকে আলীকদম | বাংলার রোড র‍্যাশ!

তৃতীয় পর্ব: সুন্দরবন | মৌয়ালদের সাথে একদিনের থ্রিলার

চতুর্থ পর্ব: হরিনাছড়া সোয়াম্প ফরেস্ট | পাহাড়ের গহীনে নতুন জলাবন

পঞ্চম পর্ব: রকেট স্টিমার সার্ভিস | ইতিহাস ঐতিহ্যে অন্যরকম নৌ-ভ্রমণ

ষষ্ঠ ও শেষ পর্ব: কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সাইক্লিং

14 thoughts on “সদরঘাট থেকে সেন্টমার্টিন | পানিপথের চতুর্থ যুদ্ধ!”

  1. ইচ্ছে করছে এখনি ঝাঁপিয়েপরি। সজ্জন কেউ থাকলে আওয়াজ দিতে পারেন। মিলে মিশে যাব।

    1. ভাই আমারও আপনার মতনই অবস্থা। আসেন ভাই আপনি আর আমি মিলেই মুভ করি ব্যক্তিগত খরচ ছাড়া বাকি সব ফিফটি ফিফটি। মুভ করলে জানাবেন অবশ্যই।

      1. ভাই ব্যাপারটা এতো সহজ হবে না, আমার বাড়ি চাঁদপুর, নিয়মিত লঞ্চেই আসা যাওয়া করি। কিন্ত এটা অনেক বড় জার্নি হয়ে যায়। যাত্রা পথে আমাদের অবশ্যই নিয়মিত বিশ্রাম নিতে হবে।

    2. Md Alamin Shaoun

      I am Md Alamin Shaoun, 01798152509,,,,,
      Please arrange a team , I will be with you…

  2. K M Rafiqul Islam

    সন্দ্বীপ থেকে কুতুবদিয়া দ্বীপ যাওয়ার ব্যবস্থা আছে কোন? লোকাল ট্রলার চলে নাকি রিজার্ভ করে নিতে হবে?

  3. ১. সেপ্টেম্বর-অক্টোবর এর আগে যাওয়া কি একটু বেশিই অ্যাডভেঞ্চারাস হয়ে যাবে?
    ২. সওদাগর নৌকা ভাড়া করতে কি রকম খরচ পরতে পারে?

    1. জুন থেকে অক্টোবর নদী সমুদ্র উত্তাল থাকে। না যাওয়াটা ভালো।
      30- 4০ হাজার এর মাঝে পাবেন।তবে দক্ষ সারেং-মাঝি লোকবল নিশ্চিত করতে ভুলবেন না।

  4. ইভেন্ট আপডেট দিয়েন। কোন একদিন যেতেও পারি। কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা।

  5. সৌরভ০১৭৫৯২৮৯০২২ আমরা তিনজন আছি কেও এরেঞ্জ করেন

Comments are closed.

Scroll to Top