fbpx

ভোর ৫ টা বেজে ৪৫ মিনিট। আমি শ্যামলী পরিবহনে ড্রাইভারের ঠিক পিছনের সিটে বসে ঢুলুঢুলু চোখে সামনে তাকিয়ে আছি। রাঙামাটি শহরের মুখে ক্যান্টনমেন্টের গেইটে আমাদের বাস গত ১৫ মিনিট ধরে দাঁড়ানো। আমি বেশ অনেকক্ষণ ধরেই কারণ খোজার চেষ্টা করছি। আমার কানে এয়ারফোনে। সেখানে বিটলস এর ‘Let it be‘ চলছিল। বন্ধ করে সামনে তাকিয়ে দেখি সাদা পোশাক পড়া কয়েকটা মানুষ জগিং করে ফিরে আসছে। আরও ৫ মিনিট পর শেষ অফিসারেরও জগিং শেষ হলো আর বাসের সামনে থেকে সিপাহী লাল পতাকা সরিয়ে নিল। ২০ মিনিট পর আবার যানবাহন চলা শুরু হলো। বাঘের সামনে ভেড়া আর ছাগলের ভিতর মনে হয় কোন তফাত নাই। আমি বুঝতে পারলাম, স্বাভাবিকতার বাইরে এখন আমার অবস্থান। “পার্বত্য শান্তি চুক্তি“ চোখের সামনে ১০০ ওয়াটের বাল্বের মতো জ্বলজ্বল করছে।

একটি ছেলে সেলফি তুলছে, কাপ্তাই ঝুলন্ত সেতু, রাঙামাটি, ফটোগ্রাফার: রাফিদ আল যাহুর

ঝুলন্ত ব্রীজ, ফটোগ্রাফার: রাফিদ আল যাহুর

রাঙামাটি শহরে আমি আগে আসি নাই। নাকি আসছি? আমি জানি না। আমি উত্তরটা খুঁজছি। এই উত্তর না পেলে মনে হয় আমার নির্বাণ লাভ হবে না। একই সাথে দুই মানুষ হয়ে দুই সময়ে বেঁচে থাকার এই যন্ত্রণা আমি কাকে বোঝাবো? মাথাটা ব্যথা করছে। আমি বাসের জানালা দিয়ে মুখ বের করে বাইরে তাকালাম। ছোট্ট ছিমছাম গোছানো একটা শহর। শহরে মুখেই দেখি একটা রাস্তার দুই পাশে রাঙামাটি সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দুইটা বাস দাঁড়িয়ে আছে। বাম পাশের বাসে সবাই বাঙালি। মেয়েদের মুখ থমথমে। লাইন ধরে সবাই বাসে উঠছে। স্কুলের ম্যাডামদের মুখ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যান্টিনের বাদামী চিকেন বনের মতো বর্ণহীন। কোন শব্দ নাই, দেখে মনে হচ্ছে হেড মিস্ট্রেস মারা গেছেন, সবাই লাইন ধরে ফিউনারেলে যাচ্ছে। ডানে তাকালাম, সব পাহাড়ি মেয়েরা হাত তালি দিয়ে গান গাচ্ছে, হৈ চৈ করে বাসে উঠছে। ম্যাডামদের পড়নে থামি, মুখের হাসি ছাত্রীদের চেয়েও চওড়া।

বনরুপায় পৌঁছে বাস থেকে নামার আগেই সমাজ, সভ্যতা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, মন – মানসিকতা, স্বাধীনতা, শোষণ, শাসন, সামরিক – বেসামরিক ভালোবাসা — সব কিছুই শ্রাবণের মেঘের মতো ঝরঝর করে কাপ্তাই লেকে ঝরে পড়ে ছদ্মবেশী দাগ কাঁটা সবুজ ক্যামেলিয়া ফুলের সাইকেডেলিক গন্ধ ছড়িয়ে দিল। এই গন্ধ তো আমি চিনি! এই গন্ধ খুঁজতে খুঁজতেই তো আমার রাঙামাটি আসা!

আকাশ থেকে তোলা কাপ্তাই লেকের ছবি, এরিয়েল ভিউ, ড্রোন ভিউ, ফটোগ্রাফার: শরিফ শামীম সুষম

কাপ্তাই লেক, ফটোগ্রাফার: শামীম শরিফ সুষম

ধর্মরাজি বৌদ্ধ বিহার থেকে এগিয়ে রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে স্টেডিয়ামের মুখে এসে দাঁড়ালাম। এমন অদ্ভুত স্টেডিয়াম আমি জীবনে দেখি নাই। রাস্তার শেষ মাথা থেকে স্টেডিয়ামের শুরু। এরপর সিঁড়ি সিঁড়ি হয়ে নিচে নেমে গেছে। অনেক পাহাড়ি ছেলে দেখলাম ফুটবল খেলছে। আমিও কি ফুটবল খেলতাম? একটা গোল বল নিয়ে দৌড়ানোর একটা আবছা স্মৃতি অবশ্য মাঝে মধ্যেই আসে। নাহ জানি না। আমি হয়তো কিছুই জানি না। আমি কে? আমি কোথা থেকে আসছি? কেন আসছি?

রাঙামাটি অদ্ভুত একটা শহর। বাংলাদেশের একমাত্র শহর যেখানে রিকশা চলে না। হয় মোটরসাইকেল না হয় সি এন জি। আমি কোনটাতেই গেলাম না। আমি হাঁটছি। একটা গলি চোখে পড়ল, কি মনে করে ঢুকে গেলাম। অনেকগুলা কাঠের বাড়ি, বাড়ির সামনে কিছু বাচ্চা ঘুরঘুর করছে। সবাই পাহাড়ি। আমি এদের চিনি! হ্যা চিনি! আমি এদেরই লোক। আমি এদেরই ছিলাম কিন্তু এখানে ছিলাম না! আমি তবে কোথায় ছিলাম?

আমাকে খুঁজে বের করতে হবে। করতেই হবে। দুপুরে খেয়ে ফিশারিজ ঘাট থেকে নৌকা ভাড়া করে শুভলং ঝর্ণার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছি। চারিদিকে অসংখ্য উঁচু উঁচু পাহাড়। উপরে মেঘলা আকাশ, নিচে কাপ্তাই লেকের টলটলা পানি। সেই পানিতে বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। আমার মাঝির নাম রক্তিম। রক্তিম চাকমা। রক্তিম বিড়ি টানতে টানতে বৈঠা বাইছে। তার চোখে অপরিসীম বিরক্তি। অলস অবসাদ গ্রস্থ এক যুবক একা নৌকায় এই অসামান্য সৌন্দর্যের মাঝে উদাস চোখে তাকিয়ে আছে; দেখে কোন মাঝিরই ভালো লাগার কথা না।

সন্ধ্যাবেলা কাপ্তাই লেক, মাছ ধরার নৌকা, পাশে ফুটে থাকা গাঁদা ফুল, ফটোগ্রাফার: পন চাকমা

কাপ্তাই লেক, ফটোগ্রাফার: পন চাকমা

কিছুদূর যাবার পর হঠাৎ দেখি পানির নিচ থেকে একটা বাড়ির মাথা বের হয়ে আছে। আমার শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেলো। আমি মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম,
— “এটা কি?”
— “পুরান রাজবাড়ির মাথা”
আমি ভয় পেলাম। প্রচণ্ড ভয়। চোখ বন্ধ করলাম আর আমি হঠাৎ বুঝতে পারলাম আমি কে। আমি কাদের খুঁজছি। ৬০ বছর! অন্তত ৬০ বছর পর আমি আমাকে খুঁজে পেলাম। আমার পায়ের নিচে কাপ্তাই লেক আর সেই লেকের গভীরে কোন এক পাহাড়ের গা বেয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কোন এক কাঠের ঘরে আমার বাড়ি, আমি ছিলাম, এখানেই ছিলাম… আজ থেকে অন্তত ৬০ বছর আগে!

কি অদ্ভুত! যে কাপ্তাই লেক আমার নিজের কাছে ফিরে যাওয়ার শেষ সুযোগটাও রাখে নাই সেই লেকের পানিতে এই সোনালি বিকেলে আমার মত এক জাতিস্মরের চোখের পানি বেহায়ার মত গড়িয়ে পড়তে থাকে।

পুরাতন চাকমা রাজবাড়ী, ছবি: বাংলাদেশের পুরানো ছবি, সংগ্রহ: বাংলাদেশ ওল্ড ফটো আর্কাইভ
পুরাতন চাকমা রাজবাড়ী, ছবি: বাংলাদেশ ওল্ড ফটো আর্কাইভ
Scroll to Top