fbpx

পুরান ঢাকা: আনন্দ অশ্রুর ৪০০ বছর

Home » পুরান ঢাকা: আনন্দ অশ্রুর ৪০০ বছর

“একজন আর্কিটেকচার স্টুডেন্ট একই সাথে একটা কামলা, একজন রাজমিস্ত্রি, একটা কাঠমিস্ত্রি, একজন রিসার্চার, একটা সায়েন্টিস্ট, একটা আর্টিস্ট, একটা ড্রাফট ম্যান, একটা ক্র্যাফটস ম্যান।”- গরমে ঘামতে ঘামতে শরবতে চুমুক দিল আমার বন্ধু মোসাদ্দেক। একটা তৃপ্তির শব্দ করে একবারে সে বাকি শরবতটুকু শেষ করে ফেললো। আমরা এসেছি পুরান ঢাকায় সাইট সার্ভে করতে, একটা ক্লাস প্রজেক্ট এর জন্য।

“আমি বেহেশতে গেলে আমার একটা ফাউন্টেন থাকবে, বিউটির শরবতের ফাউন্টেন।”, বলে মোসাদ্দেক একটা বিশ্রী শব্দে ঢেঁকুর তুলল।

আমি বললাম, “কিন্তু তুই তো দোজখে যাবি।”

— “দোজখ হবে পুরান ঢাকার মতো। চিপা চিপা একেকটা রাস্তা, দেখিস!”

— “চল, দেখি।”

পুরান ঢাকায় অবস্থিত হিন্দু ধর্মীয় শিব মন্দির, মনসা মন্দির, ফটোগ্রাফার: ফাহিম হোসেন
ফটোগ্রাফার: ফাহিম হোসেন
মুসলিম হোস্টেল, পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার, বাংলাদেশ ওল্ড ফটো আর্কাইভ, বাংলাদেশের পুরাতন ছবি
৬-৪-১৯১৩, মুসলিম হোস্টেল, লক্ষ্মীবাজার, ঢাকা, ছবি: বাংলাদেশ ওল্ড ফটো আর্কাইভ
পরিবিবির মাজার, লালবাগ কেল্লা, পুরান ঢাকা, বাংলাদেশ ওল্ড ফটো আর্কাইভ, বাংলাদেশের পুরাতন ছবি
১৯০৪, পরীবিবির মাজার, লালবাগ কেল্লা, ঢাকা, ছবি: বাংলাদেশ ওল্ড ফটো আর্কাইভ
পুরান ঢাকার বিলুপ্তপ্রায় বানর, ফটোগ্রাফার: ফাহিম হোসেন
ফটোগ্রাফার: ফাহিম হোসেন

হেরিটেজ সাইটগুলার একটা ম্যাপ হাতে আমরা পুরান ঢাকার অলিতে-গলিতে ঘুরছি। প্রথম সাইট হলো সেন্ট্রাল জেল। জেলখানার প্রাচীর যেন বহু বছরের পুরনো একটা দূর্গের দেয়াল। প্রাচীরের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে দেখলাম রাস্তায় ঘোড়ার চল এখনো আছে।

“মনে হইতেসে শায়েস্তা খাঁ-র আমলে ঢুকে পড়ছি।”, মোসাদ্দেক দাঁত বের করে হাসতে থাকে।

ম্যাপ দেখে আমরা শাঁখারি বাজার চলে আসলাম। স্থাপত্যে একটা আরবান শহুরে এলাকা তৈরির পর সেটার সার্থকতা নির্ভর করে কত মানুষ সেটা ব্যবহার করছে তার উপর। অসম্ভব সুন্দর একটা বিরাট উদ্যানে যদি কোনো মানুষ না আসে তাহলে সেটা আসলে একটা ব্যর্থ প্রকল্প। সরু রাস্তার দুই পাশে ঘেঁষাঘেঁষি করে বেড়ে ওঠা বৃদ্ধ ঢাকার গলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মোসাদ্দেক দাঁড়িয়ে গেলো। অদ্ভুত সুন্দর একটা গন্ধ। “আতরের কারখানা”, আমি বললাম। যে ঢাকায় থাকে না, সে কল্পনাও করতে পারবে না মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে আকাশচুম্বী ইট কাঠের জঙ্গলে বসে এই গন্ধ হুট করে নাকে আসলে হতভম্ব হয়ে যেতে হত।

আমরা তাঁতিবাজার ধরে হাঁটতে থাকি। অসম্ভব চিপা গলি, এত এত মানুষ, সবার মুখে হাসি। একটা গলি দিয়ে ঢুকে গেলাম। দেখলাম বাসাগুলোর বারান্দায় মহিলারা মাদুর পেতে গল্প করছে। কারো হাতে শাঁখা, কপালে সিঁদুর। কারোবা মাথায় ঘোমটা। মসজিদের পাশে মন্দির।

আমার মনে হল পুরান ঢাকার গলিগুলো থেকে আকাশের একটা ম্যাপিং করা দরকার। রাস্তা গুলো কিছুটা মঞ্চের মতো, সরু গলির উপর থেকে আলো এসে পড়ছে, স্পট লাইটের মত। যেন কেউ আমাদের টর্চ মেরে খুব সাধারণভাবে আঁকা এই অসাধারণ জীবনযাত্রা চেনাতে চাইছে।

পুরান ঢাকা, শাঁখারী বাজার, হোলি উৎসব, দোলযাত্রা উৎসব, বসন্তোৎসব তরুণদের রঙ খেলা, ফটোগ্রাফার: রাহুল তালুকদার
হোলি উৎসব, শাঁখারী বাজার, ফটোগ্রাফার: রাহুল তালুকদার
চকবাজারের ইফতার মার্কেট, মুরগির রোস্ট, মসজিদের মিনার, ফটোগ্রাফার: দেবাশীষ চান্দা
চকবাজার ইফতার মার্কেট, ফটোগ্রাফার: দেবাশীষ চান্দা
পুরান ঢাকার শাকরাইন উৎসব, পৌষ সংক্রান্তি, ফটোগ্রাফার: রাহুল তালুকদার
শাকরাইন উৎসব, ফটোগ্রাফার: রাহুল তালুকদার

আমরা সারাদিন ঘুরলাম। আহসান মঞ্জিল, রুপলাল হাউজ, ছোট কাটরা, বড় কাটরা, ঐতিহ্যবাহী রবিদাশ লেন, প্যারিদাশ লেন, বাংলাবাজার …

একটা জীবন্ত শহর, যেখানে কিছু জায়গা সারারাত জমজমাট থাকে।

“আরবান এক্টিভিটি এট ইটস বেস্ট” – মোসাদ্দেক অনেকক্ষণ কথা বলছিল না। হঠাৎ বলে উঠলো।

আমি বললাম, “তাহলে তো আনসাকসেসফুল হলো না, তাইনা?”

— “আমরা হয়তো আমাদের স্থাপত্যের স্বল্প জ্ঞানে ব্যাপারটা বুঝতে পারি নাই।”

নারিন্দা’র খান হোটেলে টাকি মাছের পুরি খেয়ে আমি আর মোসাদ্দেক সূত্রাপুরের একটা চা দোকানে বসে চা খাচ্ছি। শেষ বিকেলের অবসরে মাদ্রাসার ছেলেরা ছোট্ট জায়গায় খুব উৎসাহ নিয়ে ক্রিকেট খেলছে। ৪০০ বছর অনেক লম্বা সময়। ৪০০ বছর পুরানো এই শহরটার আবেগ, জড়তা, ভালোবাসা, হাহাকার নগরের ঐ পাশটায় খুব কমই অনুভব করা যায়; যেন এই বৃদ্ধ শহরের আনন্দ অশ্রু শুধুই শহরের এই পাশটার অহংকার।

Scroll to Top