fbpx

চট্টগ্রাম । কোনদিন মেজবান খান নাই? ছিহ!

Home » চট্টগ্রাম । কোনদিন মেজবান খান নাই? ছিহ!

গল্পের শুরুতে মেজবান নাই। শুরুটা চট্টগ্রাম থেকেও না। আমি, তাহমিদ আর সৈকত বনানীতে দাঁড়িয়ে আছি মারিয়ার জন্য। পরিবেশটা সুন্দর, কোন হৈ চৈ নাই। ভার্সিটি শেষ করে ওর এখানে আসার কথা। আঁতেল মারিয়ার কোনো খবর নাই। আঁতেলটা সম্ভবত ক্লাস শেষে অন্য আঁতেলগুলার সাথে হাইলি একাডেমিক কোনো আলোচনায় ব্যস্ত। আজকে যে একসাথে খাবার প্ল্যান আছে এইটা ওর মনেও নাই মনে হয়। ফোন ও ধরে নাহ। আমরা চার জনই একই ভার্সিটিতে পড়ি। যদিও ভিন্ন ডিপার্টমেন্টে, আমি রাষ্ট্র বিজ্ঞানে, তাহমিদ আর সৈকত বিবিএ আর মারিয়া ম্যাথ এ। বনানীতে খাইতে আসছি বলে এইটা ভাইবেন না যে আমরা খুব পশ। নিজের খরচে আমরা কালেভদ্রে খাই।

আজকে শফিক ভাইয়ের খাওয়ানোর কথা। শফিক ভাই, আমাদের তিন বছরের সিনিয়র, ছয়মাস আগে চাকরি তে জয়েন করেছে কিন্তু খাওয়ানোর ডেট দিসে আজকে। শফিক ভাই লোকটা বলদ টাইপ , হাড় কঞ্জুষ , পকেট থাইকা একটা টাকা বাইর করা যায় না। আমাদের আঁতেল মারিয়া অবশ্য সবসময় শফিক ভাইয়ের পক্ষে থাকে তার মতে ,“দোস্ত, মানুষটা কেবল চাকরি পাইছে , বেতন ও তো বেশি নাহ একটু ওয়েট কর, খাওয়াবে।” শফিক ভাইয়ের প্রতি মারিয়ার একটা সফট কর্নার আছে এটা আমরা তিনজনই মোটামুটি শিওর বাট ধরতে পারছি নাহ । ওই তো শফিক ভাই চলে আসছে ……… 

রেস্টুরেন্ট টা সুন্দর। আমরা সবাই বসে গেছি। মারিয়াও চলে এসেছে ……

— “শফিক ভাই , কি অর্ডার করব?”

— “যাই, কর ভাই আস্তে মারিস ”

সৈকত বলে উঠল , ভাই বুফে হইলে ভাল হয় “ 

ব্যস আমি দেখলাম এটাই মোক্ষম সুযোগ , এই ব্যাটারে আর কোনদিন বাগে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। আমিও সৈকতের সাথে সায় দিলাম , “বুফে” 

আমাদের মধ্যে সবচেয়ে কম কথা বলা তাহমিদও দেখলাম বলতেসে ,“ভাই ,বুফে বুফে” 

মারিয়া অবশ্য চুপ , দেখে মনে হচ্ছে শফিক ভাইয়ের জন্য তার কষ্ট হচ্ছে। তিনজনের “বুফে, বুফে “ চিৎকারে আশেপাশের লোকজন পর্যন্ত হেসে ফেলেছে। অবস্থা বেগতিক দেখে শফিক ভাই বলে উঠলেন ,” এই সব বুফে খেয়ে কি হবে আগামী সপ্তাহে চিটাগং চল , মেজ্জান খাবি” ….

ও বদ্দা , মেজ্জান হাও্যাইবেন নাহ??

সেদিন আমাদের বুফে খাওয়া হয় নাই। কিপটা শফিক ভাই আমাদের মেজ্জান খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে বুফের ব্যাপারটা লোপাট করে দিসে। আমাদের হালকা আফসোস ছিল কিন্তু মারিয়া আমাদের কে বুঝালো যে তার কোন ম্যাথম্যাটিক্যাল থিওরি বলে যে, আমরা যা খাব তাতেই নাকি লাভ আমাদের কোন লস নাই।কথা সত্য।

শফিক ভাই সহ আমরা সবাই মতিঝিলের সরকারি কলোনিতে বড় হয়েছি । খুব বেশি সচ্ছলতা আমাদের কারো জীবনেই আসেনি , আর তাইতো এক দুবার কারো উছিলায় শহরের অভিজাত এলাকার রেস্তোরাঁ তে গেলে বেশ ফুরফুরেই লাগে। যাই হোক শফিক ভাইয়ের মেজ্জান খাওয়ানোর ব্যাপারটা আমরা মোটামুটি চাপা হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছিলাম কিন্তু এবারই প্রথম দেখলাম শফিক ভাই বেশ সিরিয়াস ।

সে বুধবার আমাদের সবাইকে জানিয়ে রাখল যে বৃহস্পতিবার রাতে আমরা রওনা দিচ্ছি , সম্ভবত শফিক ভাইদের কোন পারিবারিক আয়োজন। আমাদের কারোরই মেজ্জান খাওয়া নিয়ে ধারণা নাই।আমি আর সৈকত খাই নি কোনদিনই , তবে তাহমিদ বলল ঢাকায় এক দোকানে নাকি সে খেয়েছে। এটা শুনে শফিক ভাই খিল খিল করে হেসে উঠল। এই লোকের হাসি খুবই বিরক্তিকর , কাউকে পঁচায়ে হাসার সময় কেমন যেন খ্যাঁক খ্যাঁক শব্দ করে , এরকম একটা লোকরে মারিয়া কেমনে পছন্দ করল আমার মাথায় আসেনা। 

চট্টগ্রাম এর স্মার্ট দাদু

বৃহস্পতিবার রাতে আমরা সবাই চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।সায়দাবাদ থেকে বাসে করে চট্টগ্রাম , চট্টগ্রাম থেকে হালিশহর , শফিক ভাইয়ের দাদু-বাড়ি।মোটামুটি সেফ জার্নি ছিল,  পথে বলার মত তেমন কিছু হয়নি। ও আচ্ছা , সায়দাবাদ টার্মিনালে শফিক ভাইকে হিজড়া ধরেছিল। হিজড়া আমাদের কাছে আসলে আমরা সবাই শফিক ভাইকে দেখায় দিয়ে বললাম,“নতুন চাকরি পাছে যান উনারে গিয়া ধরেন, আমরা ছাত্র মানুষ টাকা পাব কই?”পুরো রাস্তা মারিয়া আমাদের সাথে কোন কথা বলে নাই। 

হালিশহর , মূল চট্টগ্রাম শহর থেকে একটু দূরে, মোটামুটি ৬ কিলো হবে। মূল শহর থেকে এখানে সবুজের আধিক্য বেশি। শফিক ভাইয়ের কাছে শুনলাম এখানে একটা খুব সুন্দর সমুদ্র সৈকত আছে , নাম রাণী রাসমনি সমুদ্র সৈকত । নাম শুনেই তো সেখানে যাবার আগ্রহ চরমে উঠে গেল।শফিক ভাইদের বাড়িতে যখন যাই তখন সকাল সাড়ে সাতটা। গেটেই একজন খুবই ফিট স্মার্ট ভদ্রলোকের সাথে দেখা, মর্নিং ওয়ার্ক সেরে ফিরছেন, শফিক ভাইয়ের দাদু। 

ঢোকার সময় দাদু আমাদের সাথে একটা কথাও বললেন না। শফিক ভাইয়ের কাছ থেকে জানলাম ভদ্রলোক একটা সময় এই এলাকার খুব নামকরা উকিল ছিলেন। এখন আর প্রাকটিস করেন না কিন্তু রুটিন টা খুব মেনে চলেন। শফিক ভাই বললেন তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নে ঠিক সোয়া আটটায় খাবার টেবিলে দেখা হচ্ছে।

চলছে মেজবান রান্নার প্রস্তুতি
চলছে মেজবান রান্নার প্রস্তুতি

মেজ্জান না মেজবান ?

সারারাত জার্নি করে আমরা মোটামুটি সবাই ক্ষুধার্ত তাই আমরা একটু আগেই বসে পড়েছিলাম। ঠিক সোয়া আটটায় দাদু আসলেন। এবং হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন “ কি খবর তোমাদের?” এরপর তিনি নিজে থেকে আমাদের খাবার তদারকি করতে লাগলেন।এরমধ্যে আমি অবশ্য তিনটে পরোটা গরুর নলির ঝোল দিয়ে মেরে দিয়েছি।দাদুকে যতটা রাশভারী ভেবেছিলাম ততটা তো নয়ই বরং তার উলটো। মনে একটা প্রশ্ন ঘুরছিল ,ভাবলাম দাদুকেই জিজ্ঞেস করি।

আচ্ছা দাদু , “মেজ্জান না মেজবান? একটু কনফিউজড হয়ে পড়েছি” 

দাদু হেসে বললেন, “আগে খাওয়া শেষ কর, তারপর পুকুর পাড়ে বসে বলছি তোদের।” 

শফিক ভাইদের বাড়িটা বেশ পুরনো , পাকিস্তান আমলের, বাড়ির পেছনে একটা ছোট পুকুর আছে। খুব আহামরি শান বাঁধানো না, খুব ছিমছাম। পুরো পরিবেশটা অনেক ঠাণ্ডা আর শান্ত। পুকুর পাড়ে বসেই দাদু বলতে লাগলেন মেজ্জানের ইতিহাস। 

“আসলে তোদের কাছে যেটা মেজবান আমাদের কাছে সেটা মেজ্জান মানে মেজ্জান হল চট্টগ্রামের ভাষা। এই মেজবান কিন্তু বাংলা শব্দ না ফারসি শব্দ, যার অর্থ হল নিমন্ত্রণ-করতা বা অতিথি আপ্যায়নকারী , আর মেজবানির অর্থ হল আতিথেয়তা বা মেহমানদারি।আবার নোয়াখালী অঞ্চলে এই মেজবান ই জেয়াফত নামে পরিচিত। মেজবান কিন্তু কোন খাবারের নাম না এটা একটা ঐতিহ্যের নাম, একটা বোধের নাম। যার মাধ্যমে মানুষজন হোক সে চেনা আর অচেনা একবেলা একসাথে বসে পেট ভরে খায়।অনেকে ভাবে মেজবান মানে গরুর গোস্ত এটাও কিন্তু ঠিক নাহ , ধর্ম বর্ণ ভেদে খাবার এর মেন্যু বদলে গেছে, এই দেখনা হিন্দুরা কিন্তু মেজবানি তে মাছ খায়। আবার কোথাও হয়ত মুরগী – খাসি দিয়েও মেজবান হয়। জায়গা ভেদে খাবারের মেন্যু বদলে গেছে কিন্তু মেজবানি টা ঠিকই রয়ে গেছে, কি বলিস?”

“কিন্তু দাদু, কেন চট্টগ্রামের মেজবান এত বিখ্যাত?” মারিয়ার প্রশ্ন। 

রান্না করা মেজবান মাংস
মেজবান মাংস

“ হুম…… এর আসলে নির্দিষ্ট কোন কারণ বলা যাবে নাহ। তবে আমার যেটা মনে হয় যেহেতু চট্টগ্রামের মেজবানি তে গরুই মূল আকর্ষণ , আর এদেশের মুসলমানদের গরুর গোসতের প্রতি একটা আলাদা আকর্ষণ আছে তাই সম্ভবত চট্টগ্রামের মেজবান এত জনপ্রিয়। আরেকটা জিনিস তোরা জানিস কিনা এখানকার লাল গরু (রেড ক্যাটল অব চিটাগাং) সবচেয়ে উন্নত দেশী গরুর জাত। মূলত চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, বাঁশখালী, আনোয়ারা, চন্দনাইশসহ  সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলে এ গরু উৎপাদন হয় বেশি। দেখতে সুন্দর এ গরু আকারে ছোট হলেও মাংস সুস্বাদু, পুষ্টিকর। মেজবানে মূলত এই  লাল গরুর ব্যবহারই সবচেয়ে বেশি। আর তার সাথে আছে স্পেশাল মেজবানি রেসিপি, তবে সবচেয়ে বড় কারণটা হল এই মেজবান টাতে থাকে সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। চেনা অচেনা সবাই মিলে একসাথে তৃপ্তি ভরে খাবার যে আনন্দ সেটাই  সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। আর আগে তো আমরা মাটির সানকি তে খেতাম , আহা এর মধ্যেও একটা আনন্দ ছিল। এখন তো তোরা সব স্মার্ট হয়ে গেছিস প্লেট ছাড়া চলেই নাহ। যাই হোক তোরা গল্প কর আমি একটু মোস্তফার খোঁজ নিয়ে আসি।”

আপনারা যারা ভাবছেন এই মোস্তফাটা কে তাদের জন্য বলছি এই গল্পের নায়ক হচ্ছে মোস্তফা। 

“আগুনম্যান” মোস্তফা 

দাদুর সাথে গল্প করা শেষে আমরা কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিলাম। বিকেলে সবাই মিলে রাণী রাসমনির সমুদ্র সৈকতে ঘুরতে গেলাম, অসাধারণ জায়গা নাটকে অনেকবার দেখেছি । সমূদের পাশে গেলে মন ফাঁকা হয়ে যায় মনে হয় মনের হার্ড ডিস্ক টার জাঙ্ক ফাইল গুলা সব ডিলিট হয়ে গেছে। হালকা লাগে।

সন্ধ্যায় শফিক ভাইদের বাড়ি ফিরে দেখি দাওয়াতি দের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে, ছোট ছোট বাচ্চাদের আনাগোনায় পুরো বাড়ি তখন মুখরিত। ও ভাল কথা আগামীকালের মেজবান টা আয়োজন করা হয়েছে মূলত শফিক ভাইয়ের ফুঁপির নতুন সন্তানের আগমন উপলক্ষে। চট্টগ্রামের মানুষেরা না না কারণেই মেজবান আয়োজন করে, এর মধ্যে আছে বিয়ে , জন্মদিন, মৃত্যুবার্ষিকী, কারও কোন ব্যক্তিগত সফলতা, ইলেকশনে জয় ইত্যাদি। যাই হোক সেদিনের মত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম কেননা সকালে উঠতে হবে পুরো আয়োজনটা কেমন হয় সেটা পুরোপুরি উপভোগ করতে চাই। 

সকালে ঘুম ভাঙ্গল দাদুর চিল্লাচিল্লিতে। মেজবানের জন্য যে বাবুর্চি ঠিক করা হয়েছিল সে নাকি একইসাথে দুইটা মেজবানের দায়িত্ব নিয়েছে আর তাই এ বাড়িতে সে তার এসিস্ট্যান্ট কে পাঠিয়ে দিয়েছে। এ নিয়ে দাদু মহা-বিরক্ত, ফোনে তো রীতিমত ধমকানো হল। যাই হোক অবশেষে বাড়িতে আগমন ঘটল মোস্তফা বাবুর্চির। 

বাবুর্চিদের শারীরিক গঠনে একটা কমন ব্যাপার আছে। সেটা হল শরীরের সব জায়গা মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকলেও পেটের দিকটায় এসে সেটা অত্যধিক উঁচু হয়ে যায়। আমাদের মোস্তফা বাবুর্চিও এর ব্যতিক্রম নন। পরনে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গি। মাথায় টুপি আর লাল একটা গামছা দিয়ে ভুঁড়িটা বেঁধে রেখেছে। যদিও দেখে মনে হচ্ছে গামছা ফেটে ভুঁড়ি খানা বেরিয়ে আসার প্রাণপণ চেষ্টা করছে।

মোস্তফা বাবুর্চি ঢুকেই হাঁকডাক শুরু করল। ভাবটা এমন যেন তার এসিট্যান্ট রা এতক্ষণ কিছুই করেনি। মোস্তফা বাবুর্চি কে তার এলাকার সবাই চেনে আগুনম্যান নামে। সে দাবি করে সে নাকি একবার কোন এক মন্ত্রীর বাড়ির মেজবান রান্নায় আঠারো ঘণ্টা একটানা চুলার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। এরপর থেকে নাকি তার নাম আগুনম্যান। 

সিক্রেট অফ মেজবান মোস্তফা 

মেজবানি রান্নার মূল আকর্ষণ কিন্তু মেজবানি মসলায়। আমি মোস্তফা বাবুর্চির রান্নার পুরোটা সময় তাকে ফলো করেছি। হাঁক ডাক বেশি থাকলেও রান্নার ব্যাপারে সে বেশ অভিজ্ঞ এটা বোঝা যায়। ঢাকা থেকে আসা লোক তার রান্না দেখছে এ কারণে মনে হয় তার হাঁক ডাক আরও বেড়ে গেছে। আমাদের এই মেজবানের আয়োজন  অনেক বড় তাই আমি মোস্তফা বাবুর্চির সাথে কথা বলে বাসায় কিভাবে অল্প আয়োজনে মেজবানি রান্না করবেন তার একটা ছোটখাটো নমুনা তুলে ধরছি।

 মেজবানের উপকরণ

গরুর মাংস (হাড়, কলিজা ও চর্বিসহ)- দেড় কেজি, হলুদ গুঁড়া- আধা টেবিল চামচ, মরিচ গুঁড়া- ২ টেবিল চামচ,     সরিষার তেল- আধা কাপ, পেঁয়াজ কুচি- আধা কাপ, লবণ- সামান্য, কাঁচামরিচ- কয়েকটি। 

মেজবানি মসলা তৈরি উপকরণ

  • আস্ত ধনে- ১ টেবিল চামচ
  • জিরা- ১ টেবিল চামচ
  • মেথি- দেড় চা চামচ
  • রাঁধুনি- ১ টেবিল চামচ
  • সাদা সরিষা- দেড় চা চামচ
  • গোলমরিচ- ১ চা চামচ
  • শুকনা মরিচ- ৫/৬টি
  • সাদা এলাচ- ৬/৭টি
  • কালো এলাচ- ২টি
  • দারুচিনি- বড় ২ টুকরা
  • লবঙ্গ- ৬/৭টি
  • জয়ত্রী- ১টি (ছোট)
  • জয়ফল- অর্ধেকটা
  • তেজপাতা- ২টি (বড়)

মাংস মাখানোর উপকরণ

টমেটো- ১টি (ছোট করে কুচি), পেঁয়াজ বাটা- ৩ টেবিল চামচআদা বাটা- দেড় টেবিল চামচ, রসুন বাটা- ১টেবিল চামচ, তেজপাতা- ১টি, কালো এলাচ- ১টি, লবণ- স্বাদ মতো, নারকেল বাটা- ১ টেবিল চামচ, চিনা বাদাম বাটা- দেড় টেবিল চামচ। 

মাটির সানকিতে মেজবান তৈরির নানা উপরকণ
মেজবান তৈরির নানা উপরকণ

প্রস্তুত প্রণালি

মেজবানি মসলা তৈরির উপকরণ থেকে একটি তেজপাতা ও একটি কালো এলাচ সরিয়ে রেখে বাকিসব  টেলগ্রিন্ডারে গুঁড়া করে নিন। চাইলে বেটেও নিতে পারেন। মাংস মাখানোর উপকরণ দিয়ে ভালো করে মেখে নিন মাংস।

চুলায় প্যান বসিয়ে গরম করে তেল দিয়ে দিন। তেল গরম হলে পেঁয়াজ কুচি ভেজে নিন। পেঁয়াজ সোনালি হলে হলুদ আর মরিচের গুঁড়া দিয়ে দিন। সামান্য পানি দিয়ে কষিয়ে নিন। এবার মেখে রাখা মাংস দিয়ে দিন প্যানে। সামান্য লবণ দিন। মেজবানি মাংসের মসলা অর্ধেক পরিমাণ দিয়ে দিন। ভালো করে নেড়ে সব উপকরণ মিশিয়ে নিন। প্যান ঢেকে দিন। আঁচ কমিয়ে ১০ মিনিট অপেক্ষা করুন। তেল উঠে গেলে ১ কাপ পানি দিয়ে নেড়ে নিন।  চুলার আঁচ সামান্য বাড়িয়ে প্যান ঢেকে নিন। এভাবে চুলায় রাখুন ৪০ মিনিট। মাঝে মাঝে নেড়ে দিতে হবে। ৪০ মিনিট পর বাকি মেজবানি মসলা দিয়ে নেড়ে আবারও ঢেকে দিন। আরও ২০ মিনিট রাখুন চুলায়। আস্ত কাঁচামরিচ দিয়ে নেড়ে নামিয়ে নিন সুস্বাদু মেজবানি মাংস পরিবেশন করুন গরম গরম।  

আশা করছি এই রেসিপি বাসায় স্বল্প আয়োজনে মেজবানি রান্নায় আপনাদের সাহায্য করবে। 

জয় মেজবানের জয়

সাধারণত মেজবান খাবার শুরু হয় দুপুর থেকে। অতিথি ভেদে সেটা চলতে থাকে বিকেল আবার কখনো বা রাত অবধি। মোস্তফা বাবুর্চির রান্না দেখা শেষে আমি গেলাম গোসল করতে। বাড়ি ভরতি লোক এর মধ্যেও কোনোরকমে গোসল সেরে নিয়ে প্রস্তুত হয়ে গেলাম মেজবান খাবারের জন্য কেননা লক্ষ্য আমার ফার্স্ট ব্যাচ। জীবনের অন্য কোন জায়গায় প্রথম হবার কোন ইচ্ছা না থাকলেও এই একটা জায়গায় মনে প্রাণে আমি প্রথম হবার স্বপ্ন দেখি এবং তার জন্য কাজ করে যাই। 

আমি আর সৈকত প্রথম ব্যাচেই বসে গিয়েছি , তাহমিদ এখনো গোসল সারতে পারেনি। গলায় গামছা নিয়ে সে এঘর ওঘর করে বেড়াচ্ছে। মারিয়া বাড়ির মেয়েদের সাথেই আছে তাকে পেয়ে বাড়ির বড়রা তাদের বাচ্চা কাচ্চা দের সামলানোর দায়িত্ব দিয়েছে তার উপর। মারিয়া অবশ্য এনজয়ই করছে ব্যাপারটা। 

গরম ভাত চলে এসেছে। সাথে আছে বুটের ডাল , বুটের ডালের মাঝেও একটু গরুর চর্বি দেয়া আছে অন্য রকম একটা ঘ্রাণ। ভাত নিয়ে তাতে বুটের ডাল নিয়ে আস্তে আস্তে খাওয়া শুরু করেছি। পাশ থেকে কে একজন চট্টগ্রামের ভাষায় কি যেন বলল। সৈকত বলল যে ভাত কম খেতে বলেছে, গোস্ত বেশি ভাত কম। আহা ………

গরুর গোস্ত চলে এসেছে, এরকম মাখো মাখো করে গরুর গোস্ত রান্না আগে কখনো দেখি নি। ঝোল এত ঘন …… মানে কি বলব। গোস্ত মুখে দিতেই গলে গেল। হাঁক ডাক করাটা মোস্তফাকে মানায়। যারা বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে বুফে খেয়ে ফুটানি মারেন তাদের বলব সুযোগ পেলে কোন মেজবানি দাওয়াত ছাড়বেন না। একদম শর্ত প্রযোজ্য বিহীন বুফে। আর কথা নয় শুধু অল্প ভাত আর বেশি গোস্ত…… 

মেজবানি সাহিত্য 

খাওয়ার সময় তো খেয়ে গেছি , খাওয়া শেষে অনুভব করলাম নড়তে পারতেসি নাহ, বাড়ি ভর্তি লোক কোথাও বসার জায়গা নেই তাই চলে গেলাম পুকুর পাড়ে। আমার মত আরও কিছু বান্দা এখানে এসে শরীর ছেড়ে দিসে। আমাদের অবস্থা হইছে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর মশারির মধ্যে থাকা কিছু পেট মোটা মশার মত। সারারাত রক্ত খেয়ে এরা পেটের অবস্থা এমন করে যে উড়তে পর্যন্ত পারে নাহ।

পুকুর পাড়ে যারা আছি আমরা কেউ কাউকে চিনি নাহ তবে সবার একটাই মিল সবাই ভোজন রসিক। এক ভাই দেখলাম পেট হাতাতে হাতাতে গান ধরল,

     ‘ওরে দেশের ভাই/খুশির সীমা নাই/জলদি আইয়ু সাজিগুজি/মেজবান খাইবার লাই।/বদ্দা আইবো বদ্দি আইবো/মামু জেডা-জেডি/ঢাকার ভিতর চাডিগাইয়াঁ/যত বেডাবেডি, বেয়াগগুনে খুশি হইবা/ইষ্ট কুডুম পাই।/জলদি আইয়ু সাজিগুজি/মেজবান খাইবার লাই।’

পরে জানলাম এটা একটা ছড়া, সুকুমার বড়ুয়ার লেখা। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সাহিত্যে মেজবানের রয়েছে বিপুল প্রভাব। গান, ধাঁধা, চুটকি, ছড়া কোন কিছুই বাদ নেই। আর থাকবেই বা কেন মেজবান তো শুধু খাওয়া নয় , এটা একটা ঐতিহ্য, এটা একটা উৎসব। 

যাদের কপালে মেজবান এর দাওয়াত নাই 

ঐদিন সন্ধ্যায় আমাদের ট্রেন ছিল। আমরা ভালভাবেই ফিরে এসেছিলাম। সমস্যা যেটা হয়েছিল খাওয়ার কিচ্ছুক্ষণ পরেই ট্রেন থাকায় ট্রেনে উঠতে খুব কষ্ট হচ্ছিল, আমারে ঠেলে উঠানো লাগছে। সারা রাস্তা আমি ঘুমাইছি ,শফিক ভাই আমাদের সাথে আসেননি, উনি  আরও কিছুদিন থেকে আসবেন। আর হ্যা মারিয়া আর শফিক ভাইয়ের মধ্যে যে কিছু আছে বলে আমাদের সন্দেহ ছিল তা আসলে একেবারেই ভুল। মারিয়া ওই জাতেরই নাহ। এই দুই দিন সে বাচ্চাদের সামলিয়েছে আর সুযোগ পেলেই অংক কষেছে, তার নাকি আগামী সপ্তাহে সিটি। 

যাক সে সব কথা।আমার মত লাকি তো সবাই নাহ। আমি না হয় দাওয়াত পেয়েছি সবাই তো পাবেন না। এটা ঠিক যে মেজবান খাবারের আসল স্বাদ উপভোগ করতে হলে সেটা দাওয়াতি হয়েই করতে হবে , খাবার ছাড়াও চেনা অচেনা সবাই মিলে যত খুশি তত খাও এই ব্যাপারটা তো অন্য কোথাও পাওয়া যাবে নাহ। তারপরও যাদের এই সুযোগ নাই কিন্তু খাবারের স্বাদ উপেক্ষা করতে চান না , তারা নিজেরাই নিজেরে দাওয়াত দিতে পারেন, নিজেকে কোথায় দাওয়াত দিবেন সেই উপকারটা আমি করতে পারি। 

সবকিছু বিবেচনা করে আমাদের চোখে সেরা ৫ টি মেজবা রেস্টুরেন্ট এর নাম আর ঠিকানা আপনার জন্য দিয়ে দিচ্ছি।  

মেজবান নিয়ে লিখতে গেলে এই লেখা শেষ হবে নাহ। একটা কথা বলে শেষ করব, মেজবানই মনে হয় একমাত্র খাবারের আয়োজন যেখানে কোন খাবার নষ্ট হয় নাহ। যেখানে অতিথি হিসেবে সবাই যেতে পারে সেখানে খাবার নষ্ট হবার তো কোন চান্স নাই , কি বলেন……… 

Scroll to Top