ঢাকার রাস্তায় হাঁটতে গেলে আশেপাশে তাকালে ইদানিং অবাক লাগে। পোস্টার না, গ্রাফিতি না, দেয়াল ভরা কাপড়। এই দেয়ালের নাম ‘মানবতার দেয়াল’।

এটা আবার কেমন দেয়াল?

রাজধানীর দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর নবীনগর এলাকা। দেয়ালে সাজানো আছে শার্ট, প্যান্ট, সালোয়ার কামিজ কিংবা শিশুদের জামাকাপড়। রোদ-বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা করতে আছে ব্যবস্থা। একদিকে নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্র রাখা হচ্ছে, অন্যদিকে নেয়া হচ্ছে। এক রিকশা চালক বলেন,

“ভালো একটা প্যান্ট কিনতে গেলে ৫০০-৮০০ টাকা লাগে। আমি এমনিতেই পাইয়া গেলাম। আমার অনেক উপকার হইল।”

আস্তে আস্তে শুরু হয়ে ২০১৮ সালের শীতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই দেয়াল তৈরির সামাজিক আন্দোলন শুরু হয়। রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় তরুণেরা ‘মানবতার দেয়াল’ নিয়ে কাজ করা শুরু করেন। তাঁরা একটি দেয়াল নির্ধারণ করে দেন। দেয়ালের হ্যাঙ্গারে বিত্তবানেরা তাঁদের অপ্রয়োজনীয় কাপড় কিংবা কখনো কখনো জিনিস রেখে যান। আবার সুবিধা-বঞ্চিতরা এখান থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে যান। কোথাও কোন পাহারাদারও নাই! কি স্মার্ট এবং মানবিক একটা সল্যুশন!

খুলনার শিববাড়িতে অবস্থিত মানবতার দেয়াল
খুলনার শিববাড়িতে অবস্থিত মানবতার দেয়াল

শুরুটা কিভাবে?

শুরুর গল্পটা নিয়ে আসলে একটা সিনেমা বানানো যায়। মাগুরার শালিখা উপজেলার আড়পারা স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ইয়াসমিন আক্তার। ২০১৭ সালের জাতীয় শ্রেষ্ঠ শিক্ষিকা হিসাবে সম্মানিত ইয়াসমিন আপা নিজের স্কুলে এই দেয়াল চালু করেন ২০১৫ সালের শেষের দিকে। কিন্তু ধারনাটি বাংলাদেশের নিজের না।  ২০১৫ সালে ইরানের উত্তর-পূর্বের শহর মাশাদে প্রথম এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেখানে শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র পৌঁছে দিতে অজ্ঞাত কোন ব্যক্তি এমন উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ‘wall of kindness’ নামে এই দেয়ালটি ইন্ডিয়া, ইরান এবং পাকিস্তান সহ বেশ কিছু দেশে আগে থেকেই ছিল।

কিশোরগঞ্জের দক্ষিণ মুকসেদপুর প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা নাজনীন মিষ্টি। প্রাইমারি স্কুলের টিচারদের ট্রেনিং এ তিনি ইয়াসমিন আক্তার এর কাছ থেকে এই আইডিয়া পান। বাচ্চাদের মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে উনি স্কুলে ‘মহানুভবতার দেয়াল’  চালু করেন। বাচ্চারা তাঁদের পুরানো কাপড় এনে এখানে রেখে দিত, আর সুবিধা-বঞ্চিত অন্য বাচ্চারা সেই কাপড় নিয়ে যেত।

মিষ্টি আপার টার্গেট ছিল বাচ্চাদের ‘শেয়ার করা’ শেখানো। মিষ্টি আপা নিজের স্কুলে এটা চালু করার পর ফেসবুকে সেটার ছবি তুলে পোষ্ট করেন। তাঁর ফেসবুক পোস্ট থেকেই এই দেয়াল মানুষের মধ্যে ছড়ানো শুরু করে। আজকে সেটা একটা সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।

নাজনীন মিষ্টি আপা। মানবতার দেয়ালের সূচনাকারী দুই শিক্ষিকার একজন
নাজনীন মিষ্টি আপা। মানবতার দেয়ালের সূচনাকারী দুই শিক্ষিকার একজন

অতঃপর দাবানল!

মূলত ২০১৮ সালের শীতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় তরুণদের মধ্যে এই সামাজিক আন্দোলন দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে। এখন প্রায় দেশের সব জেলার সব এলাকায় স্থানীয় তরুণরা একটা করে মানবতার দেয়াল তৈরি করেছেন। রোজ দেখা যায় কেউ ব্যাগ ভরে কাপড় রেখে যাচ্ছেন, কেউ নিয়ে যাচ্ছেন। কোন কোন এলাকায় বৃষ্টিতে অনেক কাপড় নষ্ট হয়ে যেত। তখন এলাকার মুরুব্বীরা নিজেরা কাপড়ের হ্যাঙ্গারের ওপর টিনের ছাউনি তুলে দিলেন। কেউ কেউ দেয়ালের সাথে কেবিনেট তৈরি করে দিলেন।

মানবতার দেয়ালের সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপারটা হল, সবাই এটাকে দায়িত্ব নিয়ে আগলে রাখে। খিলগাঁও পল্লীমা স্কুলের পাশের দেয়ালে একটা মানবতার দেয়াল তৈরি হয়েছে। দেয়ালের পাশেই সোহেল মিয়ার টং দোকান। সেদিন হুট করে বৃষ্টি শুরু হল। সোহেল মিয়া সাথে সাথে দৌড়ে গিয়ে একটা বড় পলিথিন দিয়ে মানবতার দেয়ালটা ঢেকে দিলেন।

আলো সেচ্ছাসেবী সংগঠনের তৈরি মানবতার দেয়াল
আলো সেচ্ছাসেবী সংগঠনের তৈরি মানবতার দেয়াল

আমাদের দেশে হাজার ধরনের সমস্যা আছে। শুধু রাষ্ট্র বা সরকার সেই সমস্যার সমাধান করবে, এমনটা প্রত্যাশা করা যৌক্তিক না। যে কোন  সমস্যার সমাধানে ব্যক্তির অংশগ্রহণ জরুরি। ৫ জন ব্যক্তিও যখন সংগঠিত হয় তখন বড় বড় সমস্যা সহজেই সমাধান করা সম্ভব। আর তরুণদের পক্ষেই আসলে মানবতার দেয়ালের মত নতুন আর স্মার্ট সল্যুশনকে মূল্যায়ন করা সম্ভব।

২ জন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা তাঁদের ছাত্র ছাত্রীদের নৈতিকতা শেখানোর জন্য যে স্টেপ নিয়েছিলেন, সেই একটা স্টেপ আজকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা আসলে চাইলেই পারি। মাঝে মাঝে একটু চাওয়াটা হয় না, এই যা!

মানবতার দেয়াল, বেনাপোল, যশোর
মানবতার দেয়াল, বেনাপোল, যশোর