fbpx

কুয়াকাটা: সাগর ও একটি ছেলে

Home » কুয়াকাটা: সাগর ও একটি ছেলে

আমার ছেলেটা প্রতিবন্ধী। কথাটা কত সহজে বলে ফেললাম তাই না? আমার ছেলে, সুফি। ৫ বছর বয়স। আপনারা জানেন না, আমার ছেলেটা না দেখতে খুব সুন্দর। টানা টানা চোখ, মাথা ভরা ঘন কালো চুল। আমার রাজপুত্র ছেলেটা সারাদিন হা করে জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে। আমাদের এই ৯ তলার ৮০০ স্কয়ার ফিটের বাসাটায় মানুষ মাত্র ৩ জন। আমি, আমার ছেলে আর আমার মা।

সুফি আমার পেটে আসার ২ মাস পর ওর বাবা পি এইচ ডি করতে কানাডা চলে গেল। ৬ মাস পর আমারও যাওয়ার কথা। মন্ট্রিলের তুষার ঘন বরফে আমি আমার স্বামীর হাত ধরে ঘুরে বেড়াবো, এরপর একদিন আমার স্বামীর কাঁধে চড়ে আমাদের সেই ঘুরাঘুরিতে আরেকটা ছোট্ট পুতুল যোগ দেবে, আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকব! আহা কি আনন্দ হবে আমার! রোজ ঘুমুতে যেয়ে আমি এসব স্বপ্ন দেখতাম। আমার গায়নোকলোজিস্ট রেহানা আপা আমাকে একদিন মজা করে বললেন, ” শারমিন, মানুষ প্রেগন্যান্ট হলে দুঃস্বপ্ন দেখে, তুমি তো মেডিকেল সায়েন্সের ওয়ান্ডার উইমেন। “

দেখা গেল আসলেই আমি মেডিকেল সায়েন্সের ওয়ান্ডার উইমেন। আমার একটা ছেলে হল এবং সে মানসিক প্রতিবন্ধী। জন্মের সময় কোন একটা পর্যায়ে আমার ছেলেটা মাথায় আঘাত পেয়েছিল। কেন কিভাবে বা কোথায়? আমি জানি না। আচ্ছা আপনাদের তো বলাই হয় নি আমার ছেলেটাকে কেন কানাডার বদলে এই দেশেই জন্ম নিতে হল। ছেলে হবার ৪ মাস আগে আমি জানতে পারলাম যে আমার ছেলের বাবা মাস্টার্স করার সময় মন্ট্রিলে আরেকজনের হাত ধরে তুষার ঘন বরফে হাঁটার ওয়াদা করে ফেলেছিলেন। আমাকে আর আমার সন্তানকে বাতিলের খাতায় ফেলতে আমার প্রফেসর স্বামীর দ্বিতীয়বার ভাবতে হয় নি। এক অনিন্দ্য সুন্দর আইরিশ কানাডিয়ান মেয়েকে বিয়ে করে উনি আরেকটা সংসার শুরু করেছেন।

কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের সামনে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে, স্থান: কুয়াকাটা, ফটোগ্রাফার: রাফিদ আল যাহুর
ফটোগ্রাফার: রাফিদ আল যাহুর

আপনারা জানেন, আমার ছেলেটা কেন জানি কখনো হাসে না। ঠিক মত কথা বলতে পারে না, কথা জড়িয়ে যায়। সারাদিন ঘরে নানুর সাথে বসে থাকে, জানালা দিয়ে আকাশ দেখে। বাইরে নিয়ে বের হতে চাইলে তার সে কি কান্না! আমি রোজ অফিসে যাই। বাসায় ফিরে ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকি। মাঝে মাঝে একা একা ছাদে যাই। আমাদের এই বাড়িটা ১৫ তলা। রেলিং এর ধারে গেলে লাফ দিতে ইচ্ছা করে। দেয়া হয় না। আমার অত সাহস নেই। ছেলেটা শেষে জানালা দিয়ে আকাশ না দেখে নিচে তাকিয়ে নিজের মা’র থ্যাতলানো শরীর খুঁজবে। কি দরকার? রাত বাড়লেই সুফিটা চিৎকার করে কাঁদে। অদ্ভুত শব্দে গোঙায়। ছেলেটা একবার যদি হাসত! একটুখানি হাসত!

একদিন ঘরে বসে টিভি দেখছি। ভ্রমণ বিষয়ক কোন একটা অনুষ্ঠান। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে একটা ছেলে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ পাশ থেকে আমি হাসির শব্দ পেলাম। তাকিয়ে দেখি সুফি হাসছে। সেই রাতেই আমি কুয়াকাটার বাসের দুইটা টিকেট কাটলাম। শুক্রবার ভোর ৬ টায় আমি সুফিকে নিয়ে কুয়াকাটা বাজারে নামলাম। ছোট্ট ছিমছাম গোছানো একটা বাজার। অনেকগুলো মোটর সাইকেল দাঁড়ানো। টিভিতে দেখেছিলাম এসব মোটর সাইকেলে চড়ে সৈকত দিয়ে এগুলে লাল কাঁকড়ার বিচে পৌঁছানো যায়। আর তার একটু সামনেই এক পাশে সাগর আরেক পাশে সুন্দরবন। এসব ভাবছি হঠাৎ সুফি কেঁদে উঠলো। পুরো রাস্তা সুফি চিৎকার করে কান্নাকাটি করেছে। পুরো বাসের সবাই বিরক্ত। মধ্যবয়সী সাফারি স্যুট পড়া এক ভদ্রলোক এক পর্যায়ে বলে উঠলেন, “এই সব অসুস্থ বাচ্চা নিয়া বাসা থেইকা বাইরান ক্যান? বাচ্চার মুখ দিয়া লালা পড়তাসে, গায়ে গতরে তো বড়ই মনে হইতাসে, আবার কথা কইতে পারে না, গুঙায় ! বাসে ট্রেনে তো আরও মানুষ থাকে, এগুলা ভুইলা যান কেন?” আমি কোন উত্তর দেই নি। আমার এসব মাথাতেই নেই। আমি শুধু আমার ছেলেটাকে একটু হাসতে দেখতে চাই। আমার একটাই আশা, সাগর দেখলে আমার ছেলেটা একটু হাসবে, আমি দু চোখ ভরে দেখব!

মা কোলের শিশু আর তাঁর পিছনে তাঁর দুই বাচ্চা হেঁটে যাচ্ছে, স্থান: কুয়াকাটা, ফটোগ্রাফার: জীয়া উদ্দীন
ফটোগ্রাফার : জীয়া উদ্দীন
রাতের কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত, ফটোগ্রাফার: পন চাকমা
ফটোগ্রাফার: পন চাকমা

বাস স্ট্যান্ডের সামনেই পর্যটনের মোটেল। ব্যাগটা রেখে সুফিকে কিছু খাওয়ানোর চেষ্টা করলাম। কিছুই খেল না। একটু পর দেখি ছেলেটা ঘুমিয়ে গেছে। আমি চুপ করে বসে আছি। ৩ ঘণ্টা পর সুফির ঘুম ভাঙলো। মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম,

— “বাবা চল সাগর দেখব, সাগর”

সুফি মোটেল থেকে নামতেই চায় না। অনেক বুঝাবার পর ছেলেটা আমার কোলে চেপে নেমে আসলো। মোটেল থেকে একটু সামনে গেলেই কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত। সুফি আমার ঘাড়ে মাথা রেখে ঝিমুচ্ছে। হেঁটে হেঁটে বিচে আসলাম। পুরো বিচ খালি। কোথাও কেউ নাই। কক্সবাজারের একদম উল্টো। একটাও মানুষ নাই। চারিদিকে সাগরের শো শো শব্দ। আশেপাশে কোন বিল্ডিং ও নাই। দূরে কয়েকজন জেলে মাছ ধরার নৌকা ঠেলে পানিতে নামাচ্ছে। আমি কি করবো না করবো ভাবতে ভাবতে সুফিকে কোল থেকে নামিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলাম।

ছেলেটা চোখ কচলে কিছুক্ষণ সামনে তাকিয়ে দেখল। এরপর কি জানি হল, সে সাগরের দিকে দৌড়ানো শুরু করল। সাগরের গর্জন ছাপিয়ে আমার কানে ভেসে আসলো আমার ছেলের হাসির আওয়াজ। আমার ছেলে, আমার রাজপুত্রটা কে আমি কোনদিন এতো খুশি দেখি নাই। আহা কি আনন্দ! কি আনন্দ! কি আনন্দ!

প্রকৃতি মাঝে মাঝে আমাদের কিছু অতিরিক্ত সুন্দর দৃশ্য দেখতে বাঁধা দেয়। না হলে এমন সময় আমার চোখ ভিজে আসবে কেন?

একটা বাচ্চা দৌড়ে সাগরের দিকে যাচ্ছে, স্থান: কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত, ফটোগ্রাফার: রাফিদ আল যাহুর
ফটোগ্রাফার : রাফিদ আল যাহুর
একটা খালি চেয়ার কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে, ফটোগ্রাফার: রাফিদ আল যাহুর
ফটোগ্রাফার: রাফিদ আল যাহুর

Scroll to Top