fbpx

কেওক্রাডং: সপ্তর্ষি’র দুঃখ বিলাস

Home » কেওক্রাডং: সপ্তর্ষি’র দুঃখ বিলাস

সেই মুহূর্তে বুঝলাম, আমি আসলে জানি না ভালবাসা কি। আমি হয়ত এও জানি না আমি কে… জানি আমি শুধুমাত্র একজন ক্লান্ত মানুষ। পাহাড়ের এই অংশটুকু আগের তুলনায় বেশ খাড়া। দেড় ঘণ্টা যাবত হাঁটছি। আমি পিছনে ফিরে আমার বন্ধুকে দেখার চেষ্টা করলাম। সে মাতাল। ক্লান্ত। তবুও তার চোখেমুখে নির্লিপ্ত সুখ। আসার পথে আমাকে বলছিল, ” মানুষের সব দুঃখই দুঃখবিলাস, যদি না সে কখনও পাহাড়ে ওঠে। ” ওকে বরাবরই এমন মনে হত। নির্লিপ্ত, অন্যের অনুভূতির প্রতি সহানুভুতিহীন। এই মুহূর্তে কথাগুলো বেশ অর্থপূর্ণ মনে হচ্ছে।

যখন কেওক্রাডং চূড়ায় পৌঁছলাম তখন সন্ধ্যা নামছে। ঠিক যেভাবে ক্লান্তি আমার অনুভূতি গ্রাস করে নিচ্ছিল, সেইভাবে এই অসাধারণ মুহূর্তটা মুহূর্তেই আমার ক্লান্তিকে গ্রাস করে নিল। সূর্যটা পাহাড়ের পেছনে চলে যাচ্ছে, পাহাড়ের গায়ে বেগুনী রঙের আলো আর সমস্ত পৃথিবীটা যেন ঠিক আমার চোখের সামনে। আমাদের গাইড আমাদের তাড়া দিতে থাকে আর্মি ক্যাম্পের দিকে। আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আমরা একটা ছোট পাড়াটার দিকে রওনা দিলাম। পাড়ার নাম পাসিন পাড়া, বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু গ্রাম।

বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় কেওক্রাডং , রুমাবাজার, বান্দরবান থেকে তোলা ছবি, ফটোগ্রাফারঃ জাকিউল দীপ
কেওক্রাডং, ফটোগ্রাফার: জাকিউল দীপ

৮ ঘণ্টা হেঁটে গতকাল সকালে আমরা বগালেকে পৌঁছেছি। অনুভূতি প্রকাশে আমি বরাবরই পেছনের সারির ছাত্র। এতো উপরে এমন একটা ঐশ্বরিক লেক দেখে আমি চুপ করে থাকলাম। আমার বন্ধু আমাকে জিজ্ঞেস করলো,

__ ” ভাল্লাগতেসে না? “

__ “ হুম। “

__ ” ধুর শালা, তোকে কিছু জিজ্ঞেস করার চেয়ে মদ খেয়ে একা একা কথা বলা ভালো। “

আমি কিছু না বলে একটা সিগারেট ধরালাম। আমি আসলে স্তব্ধ। এতো সুন্দর ধারণ করার ক্ষমতা আমার নাই। নাই বলেই মনে হয় কোনদিন সপ্তর্ষিকে হাত বাড়িয়ে ছুয়ে দেখতে পারি নাই। এক বিকেলে মেয়েটা আমার শার্টের কলার ধরে কাছে টেনে একটা চুমু খেতে গিয়েছিল। আমি খুব বিরক্তির ভাব নিয়ে হাত সরিয়ে দিয়েছিলাম। চেহারায় বিরক্তির মুখোশ টেনে আমি মনে হয় আমার ভয়কে আড়াল করেছিলাম। কাছে টানার ভয়, কাছে যাবার ভয়।  

আজকে দুপুর থেকে হাঁটছি। বগালেক থেকে কেওক্রাডং। দুই হাজার ফিট উপর থেকে বগালেকের দিকে তাকিয়ে আমার লেকটার জন্য খুব মায়া হল। আহারে বেচারা কি নীরব! কি একা! কে জানে সপ্তর্ষির আমার জন্য এমন মায়া হত কি না!

বগালেক, রুমাবাজার, বান্দরবান, ফটোগ্রাফারঃ জাকিউল দীপ
বগালেক, ফটোগ্রাফার: জাকিউল দীপ

যাইহোক ছিলাম বগালেকে। এখানে একটা স্কুল আছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু স্কুল। আমি আসলে এই স্কুলটা দেখতে এসেছি। বোর্ডিং স্কুল, শুনেছি মিয়ানমার বর্ডারের ঐ পাশ থেকেও ছাত্ররা এখানে পড়তে আসে। অনেকের বাড়িতে যেতে ৩ দিন সময় লাগে। হাঁটা পথ। অদ্ভুত এক জীবন যাপন। পাহাড়ে সমতলের আগেই সন্ধ্যা নামে। অন্ধকারেই একটু দূরের এক পাহাড়ের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আমি সিগারেট ধরালাম। আমার সপ্তর্ষির কথা মনে পড়ল। আমি কি ভালবাসি ওকে? বেপরোয়া রকম একটা সম্পর্ক ছিল সত্যি। যেদিন বললাম ওকে ভালবাসি না, খুব কেঁদেছিল। ও কি জানে ওর দুঃখও দুঃখবিলাস?

পাহাড়ের কিনারে দাঁড়িয়ে সামান্য সামনে আগালাম। আকাশভরা এত তারা ঢাকায় দেখা যায় না। আমি এত মুগ্ধতা নিয়ে কখনও আকাশ দেখি নাই। তারাগুলা দেখে মনে হচ্ছে আমার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে কথা বলছে। সেই ফিসফিসানিতে প্রচণ্ড শব্দ! আমি আকাশ থেকে চোখ নামিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে দেখি সমস্ত ঝোপ জুড়ে জোনাকি জ্বলতে শুরু করেছে।

“তুমি নও তো সূর্য নও তো চন্দ্র, তোমার তাই বলে কি কম আনন্দ?”

বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু গ্রাম পাসিং পাড়া তে রাতের আকাশে তারার মেলা, স্থান: পাসিং পাড়া, কেওক্রাডং, রুমাবাজার, বান্দরবান
পাসিং পাড়া, ফটোগ্রাফার: নাসিমুল হোসেন তৌফিক

কতটা সময় এভাবে পার করেছি, মনে নেই। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ। সারা শরীর আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা হয়ে অবশ হয়ে গেছে, মাথাটা অসম্ভব আরামে ঝিম ঝিম শব্দে হালকা হতে শুরু করেছে। বগালেক থেকে কেওক্রাডং এ ওঠার সময় শেষ বিকালে চিংড়ি ঝর্নায় গোসল করেছিলাম। কে জানে ঠাণ্ডা লেগে গেলো কি না। সিগারেট শেষ করে কটেজে ফিরলাম। রাতে খেতে বসেছি। খাবারের ব্যাপারটা এখানে হোটেলের খাবারের মত না। পাসিং দা তার কটেজে আমাদের থাকতে দিয়েছেন, তিনিই মেহমানদের খাওয়াচ্ছেন। আমার মতো বেশ কিছু মানুষ পরম আগ্রহ নিয়ে সেই টেবিলে বসে খাবার খাচ্ছে। টেবিলে অনেক গল্প হচ্ছে। দূরদূরান্তের পাহাড়ের গল্প, ঝর্ণার গল্প, মানুষের গল্প, জীবনের গল্প। সাতটা ঝর্ণা একসাথে পাহাড় বেয়ে নেমে আসার গল্প, নাহলে পাহাড়ের চূড়ার উপর পায়ের নিচে মেঘ, সেই মেঘে বৃষ্টি দেখার গল্প। সেইসব পাহাড়ি জঙ্গলের গল্প যেইখানে কখনও কেউ যায় নাই। আমি আগে কখনও পাহাড়ে চড়িনি। ওদের চোখে অদ্ভুত মাদকতা, সেই মাদকতা অসম্ভব এক নেশাকে বুকে জড়িয়ে বসে আছে। যতক্ষণ এসব গল্প চলে আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকি। সবার কথার ফাঁকে আমার বন্ধু হঠাৎ বলল, ” সংকটে মানুষ নিজেকে সবচেয়ে ভালভাবে চিনতে পারে। নিজের সেই চেহারাটা সবচেয়ে সত্যি। সেই মানুষটা সবচেয়ে বেশি ভালবাসতে অথবা ঘৃণা করতে জানে। সমতলে কোন সংকট নাই। ” আমার আবারও সপ্তর্ষির কথা মনে পড়ল। ও কি পারত আমাকে সংকটে ভালবাসতে? আজকাল আমি কি খুব ঘনঘন ওর কথা ভাবছি?

আমরা খেয়ে বের হলাম। কাঠের ছোট্ট কটেজ। সামনে আর পেছনে মাচার মত বারান্দা। বারান্দা থেকে দূরের অসংখ্য পাহাড় দেখা যাচ্ছে, জ্বলজ্বল করছে কোটি কোটি তারা। পুরো জায়গাটায় নৈশব্দ আর জমাট বাধা অন্ধকার। জগৎবিখ্যাত মিউজিসিয়ান বাখ বলেছিলেন মিউজিকে তার সবচেয়ে পছন্দের জায়গা হল নৈশব্দ। রাতের সৌন্দর্য বোধহয় অন্ধকারে।

আকাশ থেকে বান্দরবানের পাহাড়ের ছবি, এরিয়েল ভিউ, ড্রোন ভিউ, ফটোগ্রাফার: শরিফ শামীম সুষম
ফটোগ্রাফার: শরিফ শামীম সুষম

রাতের আকাশের সৌন্দর্য তারায়, আর দিনের আকাশের মেঘে। এখানকার আকাশের মেঘ হাতে স্পর্শ করা যায়। টর্চ মেরে দেখলে রাতে ঘরে মেঘ ভাসতে দেখা যায়। কুয়াশা নয়, মেঘ, তুলো তুলো পেঁজা পেঁজা। ঘর থেকে বের হলাম, আকাশে আলোর নাচন এখনো চলছে। সপ্তর্ষি শুনেছি একগুচ্ছ তারার নাম। শহুরে আকাশে কখনো খুঁজে দেখিনি। জমাট বাধা অন্ধকার আর নৈশব্দে আমি আকাশে তাকিয়ে একগুচ্ছ তারা খুঁজতে থাকি…

পরদিন স্কুলটা ঘুরে আমি বিকালের নরম আলোয় কেওক্রাডং থেকে নামতে শুরু করলাম। বগালেক হয়ে একদিন পর হয়তো ঢাকা ফিরবো। সরু সবুজ পথ, দূরে সব আকাশ ছোয়া পাহাড়। সূর্য হাই তুলছে। হঠাৎ দেখি সেই পথ বেয়ে একটা সাদা ঘোড়া কেশর মেলে দৌড়ে আমার দিকে ছুটে আসছে। যেন একগুচ্ছ কাশ ফুল সবুজের মাঝ দিয়ে ছুটে বেড়িয়ে গেলো, আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম।

হঠাৎ আমার ঘোড়াটাকে সপ্তর্ষি মনে হয় … আমি সিগারেটের প্যাকেটটা খুঁজতে পকেটে হাত দিলাম।

বান্দরবান এর কেওক্রাডং পাহাড়ের সাথে মানুষের সম্পর্ক নিয়ে চিত্রকর্ম, শিল্পী: মহিউদ্দীন মজুমদার
ইলাস্ট্রেটর: মহিউদ্দিন মজুমদার
Scroll to Top