fbpx

দুর্গাপূজা | জানা অজানা দশটি ইন্টারেস্টিং তথ্য

Home » দুর্গাপূজা | জানা অজানা দশটি ইন্টারেস্টিং তথ্য

এদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজাকে মহা ধুমধামে পালন করার রেওয়াজ  কবে থেকে শুরু হয়েছিল এ নিয়ে মতভেদ থাকলেও একটা বড় অংশের মতে আজ থেকে পাঁচশ বছর আগে তৎকালীন বাংলা আর বর্তমান বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলার তাহিরপুরে জমিদার রাজা কংস নারায়ণই নাকি সর্বপ্রথম মহাধুমধামে দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। কথিত আছে তৎকালীন সাড়ে নয় লক্ষ টাকা ব্যয়ে তিনি এই পূজার আয়োজন করেন। পূজা চলছে, আর তাই আজকের লেখাকে সাজিয়েছি এই দুর্গাপূজাকে ঘিরে দশটি ইন্টারেস্টিং তথ্য নিয়ে। 

দুর্গা পূজা বছরে দুই বার হয় !!

বাংলাদেশ সহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে দুর্গাপূজা বছরে দুবার হয়ে থাকে। হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে, চিরায়ত দুর্গাপূজার সময় হল চৈত্র মাসে যেটা “বাসন্তী পূজা” নামেই পরিচিত। আর আমাদের দেশে মহাধুমধামে যে পূজা হয়ে থাকে তা হল “অকাল- বোধন “ পূজা। বাংলা আশ্বিন মাসেই এই পূজার সময়। 

দুর্গাপূজা হয় শুধু বাংলাদেশ আর পশ্চিমবংগে

হ্যা, ঠিকই শুনেছেন। দেবী দুর্গার পূজা সব জায়গায় হলেও “ দুর্গাপূজা” এই নামে হয় শুধু ভারতের পশ্চিমবংগ আর বাংলাদেশে। পশ্চিম ভারতে এ পূজার নাম “নবরত্ন” বা“গর্ভ দন্ডিয়া”, উত্তর ভারতে “রামলীলা” আর দক্ষিণ ভারতে এ পূজার নাম “গলু” বা “বনালু”। তাই এই দু দেশের বাইরে আরতি নিয়ে সাধনায় মেতে উঠতে খুব একটা দেখবেন বলে মনে হয় না। যদিও এখন প্রবাসীদের কল্যানে ছোট আকারে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে এই পূজা।

দূর্গাপূজা আরতি দিচ্ছেন একজন মহিলা
দূর্গা পূজায় আরতি দিচ্ছেন একজন মহিলা

কলাবউ কি সত্যিই গণেশের বউ? 

এটি একটি বহুল প্রচলিত ধারণা যে কলাবউ আসলে গণেশের পত্নী। কিন্তু মূলত তা নয়। কলা বউ পূজার অপর নাম নবপত্রিকা পূজা। নবপত্রিকা অর্থাৎ নয়টি পাতা বা উদ্ভিদের সমন্বয়ে এই প্রতিমা তৈরী করা হয়। এই নয়টি উদ্ভিদ হলঃ কলা, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মান ও ধান। এই নয় টি উদ্ভিদ মূলত নয়টি দেবীর প্রতীক রূপে কল্পিত হয়। আর এই নয় দেবীর মিলিত রূপ হল দেবী দুর্গা। 

সিঁদুর খেলা

পূজা শেষে বিজয়দশমীর দিনে, বিবাহিত হিন্দু নারীরা দেবীর কপাল ও পায়ের উপর সিঁদুর দান করে এবং তাকে মিষ্টি উপহার দেন। তারপর তারা একে অপরের মুখে সিঁদুর মাখিয়ে দেয় এবং একে অপরকে মিষ্টি উপহার দেয়। এর ঐতিহ্য প্রায় ৪০০ বছর আগে জমিদারদের দুর্গা পূজায় গৃহবধূদের মধ্যে সুখী বা খুশি হওয়ার জন্য উদ্ভব করেছিল।

দুর্গাপূজা দশমীর দিন সিঁদুর খেলছেন বিবাহিত হিন্দু মহিলারা
দশমীর দিন সিঁদুর খেলছেন বিবাহিত হিন্দু মহিলারা , ফটোগ্রাফার: নীলাঞ্জন রায়

মহিলারা সাধারণত লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরানো এবং ঐতিহ্যগত গহনাগুলিতে সাজেন।প্রত্যেক মহিলারা দুর্গা মায়ের জন্য আরতি করেন এবং কপাল ও পায়ের পাতায় সিঁদুর ও মিষ্টি প্রদান করেন। এর পর নারীদের একে অপরকে কপালে সিঁদুর পড়িয়া দেয়। তারপর তারা একে অপরের শাঁখা, পাল এবং নোয়া, শঙ্খ, প্রবাল ও লোহায় সিঁদুর দান করেন, যা বিবাহিত বাঙালি হিন্দু নারীদের দ্বারা পরিত্যক্ত হয়। তারপর তারা একে অপরকে সিঁদুরের মুখোমুখি করে। অবশেষে তারা প্রসাদ হিসেবে একে অপরকে মিষ্টি উপহার দেয়। সাধারনত বিশ্বাসের ভিত্তি অনুসারে, যদি যথাযথ রীতি অনুসরণ করে একটি মহিলা সিঁদুর খেলা খেলে, তবে সে কখনও বিধবা হবে না।

দেবীর সাজসজ্জা

মাটিতে গড়া দেবীর প্রতিমাকে সাজানোর সবচেয়ে পুরাতন রীতির নাম হল “ডাকের সাজ”। সেসময় জার্মানি থেকে রুপার পাত বা রাংতা আমদানি করা হত দেবীকে সাজানোর জন্য। ডাক যোগে এই সাজের উপকরণ আসতো বলে এর নাম হয় “ডাকের সাজ”। এর পর আসে “শোলার সাজ” নামক আরেক প্রকার সাজ। বর্তমানে অবশ্য দেবীকে সাজানোর জন্য ফাইবার, জরি , সোনার গহনা বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহৃত হচ্ছে। 

দুর্গাপূজা দেবী দূর্গার সাজসজ্জা পিছনে কাশবন
দেবী দূর্গার সাজসজ্জা

কুমারী পূজা

পূজার অন্যতম আকর্ষণ হল কুমারী পূজা। কিন্তু এই কুমারী পূজা কিন্তু একেনারে শুরু থেকে ছিল না, ১৯০১ সালে স্বামী বিবেকানন্দের অনুপ্রেরণায় এই পূজা শুরু হয়। আর এখন তো এটা দুর্গা পূজার অবিচ্ছেদ্য অংশ যা কিনা শাশ্বত নারীশক্তির প্রতীক। প্রতিবছর দুর্গাপূজার মহাষ্টমী পূজার শেষে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয় তবে মতান্তরে নবমী পূজার দিনও এ পূজা অনুষ্ঠিত হতে পারে।

দুর্গাপূজা অষ্টমীতে কুমারি পূজায় অসীন একটি শিশু
কুমারি পূজা

দুর্গার হাতের রহস্য

শাস্ত্র অনুসারে দুর্গার আট বা দশ হাত। যা কিনা নির্দেশ করে হিন্দুত্ববাদের আট টি দিক কে। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে দুর্গা তাঁর অনুসারীদের সমস্ত দিক হতে রক্ষা করবে। 

দেবী দুর্গা সকল দেবতার সমন্বিত রূপ

হিন্দু ধর্ম অনুসারীদের প্রধান তিন দেবতা হলোঃ শিব, বিষ্ণু ও ব্রহ্মা। আর দেবী দুর্গা হল তাদের সমন্বিত রূপ। যেমন দেবীর মুখ দেবতা শিবের মত, দেবীর দশ হাত দেবতা বিষ্ণুর মত আর দেবীর পা দেবতা ব্রহ্মার মত। 

১০৮ নামে দুর্গা 

দুর্গা অর্থ “যিনি দুর্গতি বা সংকট থেকে রক্ষা করেন” অন্যমতে, “যে দেবী দুর্গম নামক অসুরকে বধ করেছিলেন।” তবে এছাড়াও দেবী দুর্গার রয়েছে আরও ১০৮ টি নাম। যার মধ্যে  চণ্ডিকা, যোগমায়া, অম্বিকা, বৈষ্ণবী, মহিষাসুরসংহারিণী নারায়নী, মহামায়া, কাত্যায়নী ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। 

পূজার খিচুড়ি 

পূজার অন্যতম আকর্ষণ হল এই খিচুড়ি, যা মূলত ভোগের খিচুড়ি নামেই পরিচিত। অষ্টমীর দিনে বসে এই খিচুড়ি ভোজের আয়োজন। গরম গরম মুগডালের খিচুড়ির সাথে ঘিয়ে ভাজা বেগুন। আগে মন্ডপে বা পাড়া মহল্লার ক্লাব ঘরে বসত এই খাবার আয়োজন কিন্তু এখন জায়গার অভাবে প্যাকেটে করেই বিতরণ করা হয় ভোগের খিচুড়ি। 

উনবিংশ শতাব্দীর আগে দুর্গাপূজা পালিত হত শুধু সমাজের বিত্তশালী মানুষদের মাঝে। উনবিংশ শতাব্দীতে এসে তা সার্বজনীনতা লাভ করে। তখন থেকে শুরু হয় পাড়া বা মহল্লা কেন্দ্রিক কমিটির মাধ্যমে পূজা আয়োজন। সময়ের সাথে সাথে এই উৎসব ধর্ম ছাড়িয়ে গোটা জাতির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পকে বিনষ্ট করে গড়ে তুলেছে অসাম্প্রদায়িকতার সেতুবন্ধন। 

দুর্গাপূজা তে দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জন, ফটোগ্রাফার: নীলাঞ্জন রায়
দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জন, ফটোগ্রাফার: নীলাঞ্জন রায়
Scroll to Top