fbpx

দেশ ভাগ হয়েছে ৭২ বছর আগে আর দুই শহরের মধ্যে নৌ পথে শেষ যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল করেছে ৭০ বছর আগে। ভাবা যায়?

বলছি কলকাতা আর ঢাকার কথা। দুই বাংলার দুই রাজধানী। কত অজস্র পরিবার ধর্মের নামে খুন হওয়া থেকে বাঁচতে আর ব্রিটিশদের নোংরা রাজনীতির বলি হয়ে ঢাকা থেকে কলকাতা চলে গিয়েছিলেন কিংবা কলকাতা থেকে ঢাকা এসেছেন তার কোন হিসাব নাই। আজও নিজের শেকড় খুঁজে ফিরতে দুই বাংলার বহু মানুষ ওপাড় বাংলায় ফিরে যান প্রতিবছর।

পৃথিবীর ইতিহাসে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের একমাত্র উদাহরণের বলি উপমহাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দুই শহর। একই ভাষা, একই সংস্কৃতি, একই চিন্তা ভাবনা অথচ ভিসা পাসপোর্টের বেড়াজালে আজও আটকানো দুই দেশের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত দুই শহর।

দুই দেশের মানুষজন প্লেনে, ট্রেনে বা বাসে চড়েই সব সময় একে অন্যের দেশে যান। প্রতি বছর এই তিনটি পথেই মোট ১৫ লাখ যাত্রী ঢাকা কলকাতা যাওয়া আসা করে। এদিকে নৌপথে পণ্য পরিবহন চালু থাকলেও সাধারণ যাত্রীদের একে অন্যের দেশে নৌ পথে চলাচলের সুযোগ ছিল না। ব্রিটিশ আমলে আসাম থেকে ঢাকা-চাঁদপুর-বরিশাল হয়ে কলকাতা রুটে চলত স্টিমার। মোট সময় লাগত ১০ দিন। দেশভাগের পর এই সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়।

অবশেষে সার্ভিসটি হয়তো আবার চালু হচ্ছে। গতকাল ২৯ মার্চ পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকা-কলকাতা-ঢাকা রুটে যাত্রীবাহী যান চলাচল চালু হয়েছে। এদিন রাত ৮টায় ঢাকা থেকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্পোরেশনের জাহাজ এমভি মধুমতি কলকাতার উদ্দেশ্যে ছেড়ে গিয়েছে। একইভাবে কলকাতা নৌ-বন্দর থেকে বাংলাদেশের দিকে রওনা হয়েছে ভারতীয় জাহাজ ‘মেসার্স আর ভি. বেঙ্গল গঙ্গা’।

ঢাকা থেকে কলকাতাগামী এম ভি মধুমতি জাহাজ
ঢাকা থেকে কলকাতাগামী এম ভি মধুমতি জাহাজ

পরীক্ষামূলকভাবে সফল হলে ঢাকা থেকে কলকাতায় নিয়মিতভাবে জাহাজ চলবে। এই রুটের পরিধি বাড়িয়ে উত্তর ভারতের আসামের গুয়াহাটি নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও আছে। এ জন্য পরীক্ষামূলকভাবে সুন্দরবন, বরিশাল, চাঁদপুরের মতো আকর্ষণীয় এলাকা দিয়ে জাহাজটি ঘুরে যাবে। এভাবে ঢাকা থেকে কলকাতা যেতে মোট সময় লাগবে ৩৬ ঘণ্টা।

গতকাল রাত নয়টা থেকে ঢাকার পাগলা মেরি এন্ডারসন জেটি থেকে এমভি মধুমতি জাহাজটি রওনা হয়। জাহাজটি বরিশাল, বাগেরহাটের মংলা, সুন্দরবন, খুলনার আন্টিহারা- ভারতের হলদিয়া রুট হয়ে এম ভি মধুমতি ৩১ মার্চ দুপুর ১২ টায় কলকাতায় পৌঁছাবে।

ঢাকা থেকে কলকাতাগামী এম ভি মধুমতির রুট
ঢাকা থেকে কলকাতাগামী এম ভি মধুমতির রুট

মূলত পুরো ট্যুরটাই সাজানো হয়েছে সুন্দরবনকে ফোকাস করে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে আরামদায়ক পরিবেশে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট ঘুরে কলকাতা যাওয়ার এই লোভনীয় সুযোগ কোন ট্র্যাভেলারেরই হাতছাড়া করার কথা না।

একইভাবে ২৯ মার্চ ভারতের সময় রাত নয়টার দিকে ভারতীয় জাহাজ ‘মেসার্স আর ভি. বেঙ্গল গঙ্গা’ বাংলাদেশের দিকে ছেড়ে এসেছে। ১৭ দিন ঘুরে নৌযানটি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নৌপথ পাড়ি দেবে। নৌযানটি হলদিয়া দিয়ে ইমিগ্রেশনের কার্যক্রম সম্পন্ন করে বাংলাদেশে আসবে।

বাংলাদেশে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাটের মংলা হয়ে পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি আসবে ভারতীয় এই নৌযান। এর পর বরিশাল, চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জের ওপর দিয়ে ঢাকায় আসবে। ঢাকা থেকে ভারতীয় নৌযানটি সিরাজগঞ্জ দিয়ে কুড়িগ্রাম দিয়ে আবার ভারতের আসামের দিকে চলে যাবে যার মোট দূরত্ব ১৫৩৫ কিলোমিটার।

কলকাতা থেকে ঢাকাগামী আর ভি বেঙ্গল গঙ্গা শিপের রুট
কলকাতা থেকে ঢাকাগামী আর ভি বেঙ্গল গঙ্গা শিপের রুট

পরীক্ষামূলক যাত্রা সফল হলে বাণিজ্যিকভাবে ঢাকা-কলকাতা রুটে নিয়মিত যাত্রীবাহী জাহাজ চলবে। দর্শনীয় এলাকাগুলোতে ধীর গতিতে জাহাজ চালানো হবে। অনেক স্থানে যাত্রাবিরতিও করবে জাহাজটি। জনপ্রিয়তা পেলে বেসরকারি বিভিন্ন জাহাজকেও অনুমোদন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

এম ভি মধুমতির ভাড়ার তালিকা:

এমভি মধুমতিতে যাত্রী ধারণক্ষমতা প্রায় ছয়শ। এর মধ্যে কেবিনগুলোতে ১৩০ জন যাত্রী ভ্রমণ করতে পারবেন। একনজরে দেখা নেয়া যাক এমভি মধুমতির ভাড়ার তালিকা:

কেবিন ভাড়া ফ্যামিলি স্যুট (দুজন) ১৫,০০০ টাকা।
ডিলাক্স শ্রেণি (দুজন) ১০,০০০ টাকা।
প্রথম শ্রেণি (যাত্রীপ্রতি) ৫,০০০ টাকা।
ইকোনমি চেয়ার প্রতিটি ২,০০০ টাকা।
সুলভ ও ডিলাক্স শ্রেণীর যাত্রীপ্রতি ভাড়া রাখা হয়েছে ১,৫০০ টাকা।

জাহাজে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, বিকেলের নাশতা এবং রাতের খাবারের ব্যবস্থা আছে। তবে এসব খাবার যাত্রীদের কিনে খেতে হবে। এ ছাড়া ভিসাও যাত্রীদের নিজেদের উদ্যোগে নিতে হবে। ভিসায় কোন পথে যাত্রীরা যাবেন এবং কলকাতা হয়ে ফেরত আসবেন সে বিষয় ঘোষণা থাকতে হবে।

ঢাকা থেকে কলকাতাগামী এম ভি মধুমতি জাহাজের ইন্টেরিয়র
ঢাকা থেকে কলকাতাগামী এম ভি মধুমতি জাহাজের ইন্টেরিয়র

এম ভি মধুমতির রুট:

  • ঢাকা থেকে ২৯ মার্চ রাত নয়টায় রওনা দিয়ে চাঁদপুর হয়ে ৩০ মার্চ ভোরবেলা বরিশালে যাত্রা বিরতি করবে এমভি মধুমতি।
  • সেখান থেকে বাগেরহাটের মংলায় কিছু সময় থামবে জাহাজটি। বাগেরহাট থেকে সুন্দরবনে ভেতরে যাবে এটি।
  • সুন্দরবন ঘুরে মধুমতি জাহাজটি খুলনার কয়রার আন্টিহারার দিকে যাবে। সেখানে যাত্রীদের ইমিগ্রেশনের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করা হবে।
  • আন্টিহারা হয়ে সাতক্ষীরার শ্যামনগর দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের হলদিয়ায় যাবে। হলদিয়া থেকে সরাসরি কলকাতা চলে যাবে মধুমতি।
  • সর্বশেষ গন্তব্য কলকাতা নৌ-বন্দরে পৌঁছাবে ৩১ মার্চ রোববার দুপুর ১২টার দিকে।
  • রোববার কলকাতায় থেকে পরদিন ১ এপ্রিল ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেবে এমভি মধুমতি।

কাঁটাতারের বেড়ায় কাঁটা পড়া নদীমাতৃক বাংলার দুই অংশের এই যোগাযোগ এখন থেকে নিয়মিত হোক। আর সেই যোগাযোগের মাধ্যমটা হোক আরও বেশি আকর্ষণীয় এবং এক্সাইটিং। ৭০ বছর অনেক লম্বা সময়। ৪৭ এ যে মানুষগুলো এই কাঁটাতারে আটকা পড়ে নিজের পরিবার, বন্ধু, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন, যে মানুষগুলো তাঁদের আপনজনদের আর কোনদিন দেখেন নাই, তাঁদের স্মরণ করে হলেও এই যোগাযোগ নিয়মিত হওয়া অনেক আগেই উচিৎ ছিল।

Scroll to Top