fbpx

কক্সবাজার থেকে টেকনাফ | পাহাড় আর সাগরের কোলে সাইক্লিং

Home » কক্সবাজার থেকে টেকনাফ | পাহাড় আর সাগরের কোলে সাইক্লিং

Walk off-trail এ আজকে শুরু করছি ষষ্ঠ ও শেষ পর্ব: কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সাইক্লিং

আজকাল আমাদের দেশে ভ্রমণ বিলাসীদের মধ্যে অনেকেই সাইকেল নিয়ে দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করছেন। আবার কেউ ক্রস-কান্ট্রি রাইডও দিয়ে ফেলছেন কয়েকজন মিলে গ্রুপ করে করে। এদের মধ্যে অনেকেই ফেসবুকভিত্তিক বিভিন্ন সাইক্লিস্ট গ্রুপের সদস্য আবার অনেকে সিংগেল রাইডার। আপনাদের জন্যই কক্সবাজার থেকে টেকনাফ, পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত এর পাশ ঘেঁষে লোভনীয় সাইকেল রাইড দেওয়ার খুঁটিনাটি নিয়ে আজকের এই লেখা।

বিশ্বের দীর্ঘতম এই সমুদ্রসৈকতে ঘুরে বেড়ানোর জন্য, মেরিন ড্রাইভে সাইক্লিং কিংবা ড্রাইভিং করার জন্য যদি বিদেশ থেকে পর্যটকেরা এত টাকা খরচ করে আসতে পারে তবে আপনি কেন ঘরের কোণায় বসে থাকবেন? 😊

আর এত টাকা-পয়সা খরচ করে থাইল্যান্ডের পাতায়া বিচে না গিয়ে বরং নিজের দেশের সমুদ্রসৈকতের আছড়ে পরা ঢেউ দেখুন আর সাইকেল চালিয়ে টেকনাফ পৌঁছে যান।

কক্সবাজার সৈকতের সামনে একটি সাইকেল দাঁড় করানো আছে।
সাইকেলে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ যাবার পথে।

যখন সাইকেল নিয়ে মেরিন ড্রাইভের রোড পাড়ি দিবেন এবং হলিউডি সিনেমার মত আপনার একপাশে পাহাড় আর অন্যপাশে দিগন্তবিস্তৃত অসীম নীল জলরাশি দেখবেন তখন নিজেকে মনে হবে যান্ত্রিক জীবন থেকে পালিয়ে আসা এক অচেনা কোন মানুষ।

আর সাথে ফাও হিসেবে কক্সবাজারের সমুদ্র-পাড়ে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত আর সমুদ্রস্নানের কথা তো বললামই না। 😍

নিজের সাইকেল নিয়ে কক্সবাজার!

আপনি যদি নিজের সাইকেল ব্যবহার করতে চান তাহলে নিজের সাইকেল নিজেকেই কষ্ট করে বয়ে নিয়ে যেতে হবে। বাস কাউন্টারে আগেভাগে বলে রাখতে পারেন যে আপনি সাইকেল নিয়ে যাবেন। তখন হয় আপনি সাইকেল বাসের ছাদে শক্ত করে বেঁধে নিয়ে যেতে পারবেন কিংবা সাইকেলের বডি,সিট এবং চাকা খুলে বক্সের মধ্যে নিয়ে যেতে পারবেন।

আবার সাইকেলের পার্টস খুলে বক্সের মধ্যে করে নিয়ে গেলে রাস্তায় গাড়ির ঝাঁকুনিতে ড্যামেজ হওয়ার হাত থেকে আপনার সাইকেলটা বেঁচে যাবে কিন্তু এক্ষেত্রে আপনার নিজেকে সাইকেলের পার্টস ঠিক করার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ হতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজারের কয়েকটা দোকানে স্বল্প টাকায় সাইকেল ভাড়া পাওয়া যায়। তখন দিন হিসেবে সাইকেল ভাড়া করতে পারেন। 🚴

কোন ধরণের সাইকেল নেব? 

আপনার পছন্দমত এবং ব্যবহার করতে ভালো লাগে এমন যে কোন সাইকেলই আপনি নিতে পারেন এই ট্রিপের জন্য।রাস্তায় বালু থাকে বলে কেউ কেউ MTB সাইকেল চালাতে পছন্দ করেন কারণ Roadies সাইকেল বালুতে চালানো একটু কষ্টকর।

MTB এর বাইসাইকেল
MTB এর বাইসাইকেল

বিশ্রাম নিব না?

টানা সাইকেল চালানো তো আর চাট্টিখানি কথা নয়। আমরা ঠিকই জানি মেরিন ড্রাইভ ধরে চলতে চলতে একটু পর পর আপনি বিচ ধরে সাইকেল চালানো শুরু করবেন। কেনই বা করবেন না? এত সুন্দর এক্সপেরিয়েন্স তো রোজ রোজ নেয়া যায় না। বিচ ধরে সাইকেল চালানো বেশ কষ্টের কাজ ও। তাই একটু পর পর বিশ্রাম নেয়া জরুরী। রাস্তায় আপনি চাইলে শামলাপুরে থামতে পারেন অথবা ঝাউবনের ছায়ায় বিশ্রাম নিতে পারেন। 👌

শামলাপুর সম্ভবত বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর সী বিচ। এই বিচ এখনো ঠিক আগের মত আছে। কলাতলির মত নষ্ট হয়ে যায়নি এক ফোঁটাও। সারাদিন কাঁকড়া এদিক ওদিক ঘুরঘুর করে। মাঝরাতে সাম্পান নিয়ে দূর দরিয়ায় মাছ ধরতে যায় জেলেরা। বিচেই একটা মসজিদ আছে। আছে টিউবয়েল। রাস্তার অপরপাশেই আছে বাজার। একটা হ্যামক টানিয়ে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকেন। সবচেয়ে ভালো লাগার গানগুলা শুনেন, নিজেকে সময় দেন। 

শামলাপুর সী বিচে হ্যামক টানিয়ে একজন শুয়ে আছেন।
শামলাপুর সী বিচ, ছবি: ওয়াক বাংলাদেশ

রাস্তার অপরপাশেই আছে শামলাপুর বাজার। সবকিছুই কিনতে পাওয়া যায়। সামুদ্রিক মাছ দিয়ে এক প্লেট ভাত খেয়ে নিতে পারেন। খারাপ লাগার কোন চান্স নাই। 

সময়

কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত প্রায় ৮০ কিলোমিটার লম্বা এই মেরিন ড্রাইভ পাড়ি দিতে কতটুকু সময় লাগবে সেটা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে আপনি কতটুকু স্পিডে সাইকেল চালাচ্ছেন এবং কতক্ষণ পর পর বিশ্রাম নিচ্ছেন তার উপরে।

তবে মাঝারি গতিতে যদি সাইকেল চালিয়ে যান তাহলে আপনার সময় লাগতে পারে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টার মত। বেশি বিরতি না নিয়ে ভোরে রওনা দিয়ে ঐদিনই ফিরে আসতে পারবেন। 🚴🚲

খাওয়া দাওয়া

ট্রিপের সময় যাত্রাপথে খুব কমই খাবারের দোকান পরবে। তাই কক্সবাজার থেকে মেরিন-ড্রাইভের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার আগে ভালো করে খাওয়া-দাওয়া করে নেন যেন দুর্বল হয়ে না যান। শামলাপুর বাজারে একটা খাবারের ব্রেক নিতে পারবেন। মাঝেমধ্যে ডাবের দোকান এবং ছোট ছোট চা-নাস্তার দোকান পাবেন যেখান থেকে অল্পস্বল্প খাবার খেয়ে নিতে পারবেন।

এখানে কম দামে ডাব পাওয়া যায়, এটা দিয়ে শরীরের পানির চাহিদা এবং তেষ্টা দুটোই মেটাতে পারবেন। 🥥🥥

খরচ 

আপনার গন্তব্যস্থল থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত আসতে যতটুকু খরচ লাগবে সেটা বাদ দিলে এই ট্রিপের জন্য তেমন কোন খরচ নেই বললেই চলে।

ঢাকা থেকে কক্সবাজার এসে আপনি যদি ২ দিনের জন্য খাওয়া-দাওয়া এবং থাকার খরচসহ একটা বাজেট ট্যুর দিতে চান তবে ৪/৫ হাজারের মধ্যেই সবকিছু হয়ে যাবে। আর গ্রুপে করে দলবেঁধে আসলে খরচ আরো কমে যাবে। 

কিভাবে যাবেন ? 

ঢাকা-কক্সবাজার

🚌🚌🚌 ঢাকা থেকে কক্সবাজারে সরাসরি বাসে করে যাওয়া যায়। এসি, নন-এসি, লোকাল সব ধরণের বাসই সকাল এবং রাত্রের ট্রিপে চলাচল করে এই রুটে। ঢাকায় যে কোন বাস কোম্পানির কাউন্টার থেকে টিকেট বুকিং করে রওনা দিয়ে দেবেন এবং রাস্তাঘাটে জ্যাম না থাকলে আশা করি ১০-১২ ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাবেন কক্সবাজার প্রধান বাসস্ট্যান্ডে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার 

আপনি যদি চান যে কক্সবাজার যাওয়ার আগে চট্টগ্রাম যাত্রাবিরতি করবেন তাহলে সেটাও করতে পারবেন।ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে বাস কিংবা ট্রেনে আসতে পারবেন, বাস ভাড়া নন-এসিতে ৫৫০ টাকার মত আর এসিতে ১১০০ টাকা নেওয়া হয়,ট্রেন ভাড়া চেয়ার-কোচে সাধারণত ৩৫০ টাকার মত হয়ে থাকে।

চট্টগ্রামে দামপাড়া বাসস্ট্যান্ডে নেমে আপনি চাইলে আশেপাশের হোটেলে খাওয়া আর বিশ্রাম সেরে চট্টগ্রাম শহরটা ভালো করে ঘুরে দেখতে পারেন।

এরপরে চান্দগাঁও বাস টার্মিনাল থেকে আপনি পেয়ে যাবেন কক্সবাজার যাওয়ার অসংখ্য বাস। তবে আপনি যদি কক্সবাজার থেকে সাইক্লিং শুরু না করে টেকনাফ থেকে সাইক্লিং শুরু করতে চান তাহলে আপনাকে কক্সবাজারে বাস থেকে নেমে লিংকরোডে গিয়ে সেখান থেকে ১২০ বা ১৪০ টাকায় টেকনাফগামী বাসে উঠতে হবে, কারণ চট্টগ্রাম থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সরাসরি বাস সার্ভিস তেমন নেই বললেই চলে। 

গুগল ম্যাপে দেখে নেয়া যাক কক্সবাজার থেকে টেকনাফ যাবার রাস্তা র‍্যুট:

শুরুটা যাদের সাথে

🚲🚲 সাগরের পার ঘেঁষে সাইকেল চালানোর এই অভিজ্ঞতা সাইক্লিস্টদের জন্য আর ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা। তাই অনেক সাইক্লিস্ট কম্যুনিটি আর সাইক্লিস্ট গ্রুপ নানা সময় বিচ ধরে বা এই মেরিন রোডে সাইক্লিং করেছেন। “মৌলভীবাজার সাইক্লিস্ট কমিউনিটি”র তিনজন সদস্য তাদের তেতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সামাজিক সচেতনতামূলক সাইকেল ট্রিপের অংশ হিসেবে কক্সবাজার টেকনাফের এই মেরিন রোডটি পাড়ি দিয়েছিলেন।

এছাড়া ঢাকার মিরপুর ভিত্তিক সাইক্লিস্টদের সংগঠন ‘মিরপুর সাইক্লিস্টস’ এর সদস্যরা মেরিন ড্রাইভের এই রোডে সাইক্লিং এর আয়োজন করেছিলেন। তবে সাইক্লিস্ট গ্রুপের সদস্য না হলেও কক্সবাজারে বেড়াতে আসা অনেক ট্র্যাভেলার এখান থেকে সাইকেল ভাড়া করে অথবা নিজের সাইকেল নিয়ে মেরিন রোডে সাইকেল চালিয়েছেন। 🚲🚲

কক্সবাজার থেকে টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ রোডের ড্রোণ ভিউ।
পাখির চোখে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ রোড।

নিরাপত্তা 

রোহিঙ্গা ইস্যু এবং মাদক চোরাচালানের কারণে কক্সবাজার আর টেকনাফের নিরাপত্তা পরিস্থিতি কিছুটা কড়াকড়ি হলেও ভ্রমণকারীদের জন্য নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা সবসময়ই আন্তরিক। আইনশৃঙ্খলা বিরোধী কোন কর্মকাণ্ড না করলে স্থানীয় পুলিশ এবং বিজিবির সদস্যরা আপনাকে সবসময়ই সহযোগিতা করবেন।

আর বর্ষাকাল ছাড়া বছরের অন্যান্য সময়গুলোতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা পাহাড় ধসের মত দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনাও তেমন থাকেনা।

টিপস! 

  • সাইকেল নিয়ে যেহেতু যাচ্ছেন তাই সাথে করে সাইকেল মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় সব টুকিটাকি যন্ত্রপাতি নিতে ভুলবেন না।
  • নিজে সাইকেল চালাবেন,তাই শরীরে পানি,মিনারেল আর গ্লুকোজের ঘাটতি দেখা দিবে।এজন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি,ওরালস্যালাইন এবং গ্লুকোজ পানি সাথে করে নিবেন।
  • রাস্তায় তেমন দোকান-পাট পাবেন না, শুকনা খাবার সাথে করে নেওয়া তাই অবশ্যকর্তব্য।
  • পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায় অল্পস্বল্প সাইক্লিং করার অভিজ্ঞতা থাকলে ভালো, না হয় অল্পতে ক্লান্ত হয়ে যাবেন।
  • সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি যেন ত্বকের ক্ষতি করতে না পারে সেজন্য সানস্ক্রিন লোশন ব্যবহার করবেন।
  • সাইকেল চালানোর সময় ধুলাবালি না ঢোকার জন্য সানগ্লাস ব্যবহার করবেন।

ভুলে যাবেন না!  

  • সবসময় জাতীয় পরিচয়পত্র বা অন্য যে কোন পরিচয়পত্র সঙ্গে করে রাখবেন।
  • রাস্তার বামপাশে করে সাইকেল চালাবেন।
  • হেলমেট ব্যবহার করতে ভুলবেন না।
  • সাইকেলের গতি বাড়িয়ে প্রতিযোগিতা করতে যাবেন না,কারণ আঁকাবাঁকা রাস্তায় অনেকসময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
  • অনেকক্ষণ ধরে একটানা সাইকেল না চালিয়ে বরং ক্লান্ত হলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার চালাতে পারেন। একটানা বেশিক্ষণ ক্লান্ত অবস্থায় সাইকেল চালালে মাংসপেশি অসাড় হয়ে যেতে পারে অনেক সময়।
  • সবশেষে অবশ্যই এবং অতি অবশ্যই যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে পরিবেশ নষ্ট করবেন না।

আপনার যাত্রা উপভোগ্য হোক। 

এই ব্লগটি নিয়ে বিস্তারিত রিসার্চ করেছেন তৌফিক মাহবুব। আর ব্লগটি লিখেছেন Urmi Tanchangya 

Walk off-trailআমাদের নতুন সিরিজ। ৬ পর্বের এই ব্লগ সিরিজে আমরা বাংলাদেশের ৬ টা অফট্রেইল ট্র্যাভেলিং এর ডিটেইলস জানব। এই ট্রিপগুলা মোটেও বহু প্রচলিত না। এদের কয়েকটা খুবই কঠিন, ভয়ংকর; কয়েকটা খুবই সহজ কিন্তু খুব আন্ডাররেটেড, কয়েকটা একদমই সিম্পল। কিন্তু সবগুলা ট্রিপই অসাধারণ এক্সাইটিং এবং বেশ সস্তা। আপনার যা লাগবে সেটা টাকা না, সেটা হচ্ছে ইনফরমেশন, আগ্রহ এবং ট্র্যাভেলিং এর নেশা।

প্রথম পর্ব: সদরঘাট থেকে সেন্টমার্টিন | পানিপথের চতুর্থ যুদ্ধ!

দ্বিতীয় পর্ব: থানচি থেকে আলীকদম | বাংলার রোড র‍্যাশ!

তৃতীয় পর্ব: সুন্দরবন | মৌয়ালদের সাথে একদিনের থ্রিলার

চতুর্থ পর্ব: হরিনাছড়া সোয়াম্প ফরেস্ট | পাহাড়ের গহীনে নতুন জলাবন

পঞ্চম পর্ব: রকেট স্টিমার সার্ভিস | ইতিহাস ঐতিহ্যে অন্যরকম নৌ-ভ্রমণ


Scroll to Top