fbpx

সিলেট থেকে টেকনাফ | ২ চাকায় ২০০০ কিলো

Home » সিলেট থেকে টেকনাফ | ২ চাকায় ২০০০ কিলো

কাকন মামার টং এ হুটহাট প্ল্যান করে ফেলি। বান্দরবান হয়ে কাপ্তাই, কর্ণফুলী নদীতে কায়াকিং করে আমাদের ট্যুর শেষ হবে। তিন দিনের প্ল্যান, কিছুটা এমন: সিলেট-চট্টগ্রাম-বান্দরবান-কাপ্তাই-সিলেট। প্রতি বাইকে ২ জন করে বাইক আছে ৩-৪ টার মত আর তাতে ৭-৮ জন হয়ে যায় সব মিলিয়ে।

যেই ভাবা সেই কাজ। সিলেট থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-কুমিল্লা হয়ে একদিনে চট্টগ্রাম, ঐদিন চট্টগ্রামে বাইকের টুকটাক কাজ সেরে ফেললাম। পরদিন সকালে যখন আলীকদমের উদ্দেশ্যে রওনা দেই তখন থেকেই আর কোন কিছুই প্ল্যান মত হয় নাই। আর হ্যাঁ ততক্ষণে বাইক ৬ টা, মানুষ ১২ জন। আর এর মধ্যে বোজোর ১০০ সিসি তে বোজো বসলেই বাইকের জীবন যায় যায় অবস্থা। আলীকদম ক্যান্টনমেন্ট থেকে আরেকটা বাইক ব্যবস্থা হয়ে যায় সেই খুশিতে ভোরে উঠে চলে যাই ক্যান্টনম্যান্টের পিছনে মাতামুহুরি নদীর ব্রিজের উপর। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা মাতামুহুরি চলে গেছে নিজের ইচ্ছামতন।

ছুটে চলার ফাঁকে
ছুটে চলার ফাঁকে

আলীকদম থেকে ভোর সাড়ে পাঁচটায় রওনা দিয়ে একেবারে থানচি যেয়ে নাশতা করব,চিন্তাভাবনা কিছুটা এমনই ছিল। ঘণ্টাখানেক পর আমরা আবিষ্কার করলাম একদল ২৫০০ ফিট উঁচু ডিম পাহাড়ের উপর, আরেকদল ডিম পাহাড়ের নিচে। বাইক ৭ টার মধ্যে ১ টা বন্ধ হয়ে গেছে আরেকটার পিছনের চাকায় পাম কম, কোনমতে একজন চালানো যাবে। ৬-৭ ঘণ্টা ডিম পাহাড়ের উপরে বসে দূরের থানচি বাজার দেখা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। বিকাল ৪ টা নাগাদ ব্যর্থ চেষ্টা শেষে আলীকদম পাঠিয়ে দেওয়া হয় একটা বাইক। তারপর কোনমতে থানচি পৌঁছাই সন্ধ্যা নামার ঘন্টাখানেক আগে। 

মোটর সাইকেল আর থানচির পথে
থানচির পথে

বিকেলে হাঁটু পানির সাঙ্গুতে চিত হয়ে শুয়ে থেকে সারাদিনের সব ক্লান্তি অবসাদ সব আস্তে আস্তে চলে যেতে থাকে।সাথে চলে যায় একজনের বাইকের চাবি। সন্ধ্যা হয়ে রাত নেমে আসে মাথার উপর একটা চাঁদ নিয়ে। থানচি ব্রিজে বসে চাঁদের আলোয় ডিম পাহাড়ের অবয়ব দেখতে দেখতে সময় চলে যায়। জীবনটাকে খুব সুন্দর লাগে; মন চায় কবি হয়ে যাই। সেই রাতে সাঙ্গু’র তীরে বেসুরো গানের সাক্ষী চাঁদ, সেই চাঁদের আলোয় বার বি কিউ হয়, মনে প্রাণে চায় সময়টা থামিয়ে দেই অনন্তকালের জন্য।

পরদিন সকালে থানচি থেকে বান্দরবান যেতে আবার জীবননগর ঢালে বাইক নষ্ট, এবার বোজোর ১০০ সিসি কাইত। ২-৩ ঘণ্টা বাইক নিয়ে বসে থাকার পর চান্দের গাড়িতে করে বোজোরে বান্দরবান পাঠাই দেই। সন্ধ্যায় নীলাচল পাহাড়ের উপর বসে গান গাইতে গাইতে একে একে জ্বলে ওঠা বান্দরবান শহরটা দেখতে অপার্থিব সুন্দর লাগে। কতজনের মুখে কত আশা হতাশা বের হয়ে আসে অবলীলায়, সেইসব আশা হতাশা ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়ে চলে আসি আমরা বান্দরবান শহরে। বাইকের সংখ্যা এখন ৪ আর মানুষ ৯ জন, বান্দরবান এসে বাইকের যা যা সমস্যা ছিল সবই সমাধান হয়।

সকালে তাসনিম ভাই, বোজো,জিসানকে বিদায় দিয়ে বান্দরবান থেকে কাপ্তাই পৌঁছাই খুবই তাড়াতাড়ি। যে কায়াকিং ছিল ট্যুরের মেইন প্ল্যান, কাপ্তাইমুখের ফ্লোটিং প্যারাডাইজে বসে কায়াকিং এর প্ল্যান বাদ দিয়ে চলে গেলাম কাপ্তাই-রাঙামাটি লিংক রোড ধরে। এই লিংক রোডের দৈর্ঘ্য ৩৫ কিলোমিটার, বাংলাদেশের সুন্দর কিছু রাস্তার তালিকায় সবচেয়ে উপরেই রাখব আমি একে। 

কাপ্তাই এ বাইক বিলাস
কাপ্তাই এ বাইক বিলাস

এভাবে রাঙামাটি খাগড়াছড়ি হয়ে চলে আসি বাঘাইহাট বাজারে, মাথায় ঘুরছে তখন সাজেকের প্ল্যান। বাঘাইহাট বাজারে যেতেই ঝুম বৃষ্টি এর মধ্যেই রওনা দিলাম সাজেকের উদ্দেশ্যে। মেঘ বৃষ্টিতে মাখা রাস্তায় লাল টেইল লাইট গুলো খুব মায়া ছড়ায়। 

সাজেকের পথে
সাজেকের পথে

দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম সাজেক।রাতে ভরপেট খেয়ে মাচাং এর বারান্দাতেই ঘুম সব, সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখের সামনে এক মেঘের সমুদ্র। এই মুগ্ধতা আর কখনো আসবে না যতবারই সাজেক যাই না কেন। ফেরার কথা ছিল সকালের এস্কর্টে, কিন্তু পিচ্চি পোলাপান খেলতে যেয়ে বাইক ফেলে দিয়ে এয়ার চেম্বারে তেল ঢুকে যায়। অনেক ঝামেলা করে বাইক ঠিক করে বিকালের এস্কর্ট ধরলাম কোনোমতে আর তাতে খাগড়াছড়ি পৌঁছাইতে ঠিক সন্ধ্যা হয়।

হালকা চা পানি খেয়ে চট্টগ্রাম এর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ফটিকছড়ির দিকে  রাস্তার দুইপাশের গাছ দিয়ে একটা টানেল এর মত হয়ে আছে আর মাথার উপরে চাঁদ, বিশাল বড় থালার মত এক চাঁদ। সুস্থ মানুষের পক্ষে এমন সময়ে এক বাইকে তিনজন করে বসে গান গাওয়া সম্ভব না। চট্টগ্রাম পৌছাই আমরা রাত ১১-১২ টার দিকে ততক্ষণে পাহাড়ি সমতল মিলে প্রায় ২০০ কিলো চালানো হয়ে গেছে।

গাছের নিচে একটি বাইক দাঁড় করানো
পথিমধ্যে বাইকেরও দরকার বিশ্রাম

হঠাৎ মাথায় ভূত চাপলো। কক্সবাজার যাব।

শুরু হলো যাত্রা। দুপাশে গাছ পিছনে সরে সমুদ্র আমাদেরকে কোলে টেনে নিচ্ছে। কক্সবাজার পৌঁছাতে তখনো আরও প্রায় ১৪০ কিলোর-মতন বাকি। কাঁধের দশ কেজির বোঝাটার ওজন প্রতিনিয়ত বাড়ছে বলে মনে হচ্ছিলো।

রাত ২.৩০-৩ টা বাজে।কক্সবাজারের খুব কাছাকাছি এসে হুট করে গাঞ্জো বাইকের লাইট অফ করে দিল, দিয়া কয় “মামা চান্দের আলোয় চালাই কি কস”। বাইকের কিলোমিটারের কাঁটা ৯০ ছুঁই ছুঁই, চাঁদের আলোয় অল্প কিছুক্ষণ সময় অনন্তকাল মনে হয়। ভয় লাগে খুব,এই সুন্দর জীবনের জন্য।৩ টা নাগাদ কক্সবাজার পৌঁছাই আমরা। এই ৩৪০ কিলোর গল্প আমি সারাজীবন করতে পারব, তাতে ক্লান্তি আসবে না।

সাগর সৈকতে দুই নৌকার পাশে ৩ টি মোটর সাইকেল
মেরিন ড্রাইভে

কক্সবাজার থেকে মেরিন ড্রাইভের হয়ে টেকনাফের দিকে একটা শান্তির জায়গা শামলাপুর। বিচটাও শান্তিময় এক জায়গা, পাশের মাখনের মত মেরিন ড্রাইভে ১১০ কিলো গতি উঠার পর মনে হয় অনেক হয়েছে,এইবার ফেরার পালা। মাথায় বাজছে ববি বেয়ারের ফাইভ হান্ড্রেড মাইলস এওয়ে ফ্রম হোম,অবশ্য আমিতো বাড়ি থেকে আনুমানিক ৫০০ কিলো দূরে। যাক একক এর অস্তিত্ব এসব ক্ষেত্রে খুব হালকা। পাহাড়ের উপর টেকনাফের রিজার্ভ ফরেস্টের বিশাল গর্জন গাছগুলো হাতছানি দিয়ে ডাকে। ক্লান্ত দেহ মন তাতে সাড়া দিতে পারে নাই, এইবার ফেরার পালা। ফিরতে হবে ৫০০ কিলো দূরের শহর সিলেটে।এভাবে ছুটতে ছুটতে বাইকের গতি কমিয়ে জীবনের গতি নিয়ে ভাবনা চলে আসে। জীবনের অর্থ গুলো আরেকবার ভেবে নিতে থাকি।জীবন মানে আসলে কি?কিসের পিছনে সে ছুটে চলা? জানি না। সব জানতে নাই, বেশ তো আছি। গিয়ারটা পালটে আবারো ছুটে চলি।

প্রতিনিয়ত চেঞ্জ হওয়া এই ট্রিপের গল্প বললে শেষ হবে না। গল্প হবে টং এ, গল্প হবে আড্ডায়।

৯ দিন ২০০০ কিলো ১১ জেলা। জীবন।

Scroll to Top